শনিবার , জুলাই ২০, ২০১৯
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

রেলগাড়ি আবিস্কারের পেছনে মজার যে ঘটনা…

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক

বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কারের পেছনে বিজ্ঞানীদের রয়েছে নিরলস পরিশ্রম আর বেশ কিছু মজার মজার ঘটনা। মানব কল্যাণের জন্য মজার মজার কাণ্ড করে তারা আবিষ্কার করেছেন বিভিন্ন রকম বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। তেমনি বর্তমান যুগের অন্যতম বাহন রেল ইঞ্জিন আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে এক মজার ঘটনা।

ফ্রাঞ্চে নিকলাস কুনু নামে ছিলেন এক ইঞ্জিনিয়ার। ইঞ্জিনের সাহায্যে গাড়ি চালানো যেন পেয়ে বসল তাকে। শেষে একদিন আবিষ্কার করলেন একটি তিন চাকার গাড়ি। পেছনে বয়লার রেখে বয়লারের বাষ্পকে নিয়োগ করলেন চাকা ঘোরানোর কাজে। দীর্ঘকালের প্রচেষ্টা সফল হলো। ঘন্টায় চার মাইল গতিবেগে চলতে শুরু করলো গাড়ি। উৎসাহিত কুনু একদিন দু একজন বন্ধুকে নিয়ে চেপে বসলেন গাড়িতে কিন্তু দুর্ভাগ্য কুনুর, গাড়ি চলতে চলতে এক সময় ধাক্কা খেল রাস্তার ধারের একটি দেয়ালে। বয়লার গেল ফেটে এবং কুনু সহ জাতির ছিটকে পড়লো। আঘাত গুরুতর না হওয়ায় সেদিন প্রাণে রক্ষা পেয়েছিলেন সবাই। তবে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন অনেকে। ধারণা করেছিলেন গাড়ি একটা বিপদজনক জিনিস। এতে আহোরন করলে যে কোনো সময়ে বেঘোরে প্রাণটা যাবে।

কুনোর ওই গাড়ি চালানোর ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত সরকার অবধি গড়িয়েছিল আর সরকার জনমতের চাপে গাড়ির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। আর বেচারা কুনের কি হয়েছিল জানেন, শুধু তার গাড়িটাকে বাজেয়াপ্ত করা হয়নি তাকে জেলখানায় দেয়া হয়েছিল। কুনোর পরে আরো একজন ইঞ্জিনিয়ার ইউলিয়াম মারডক একটি বিশেষ ধরনের গাড়ির ইঞ্জিন তৈরি করলেন। যেটি ছিল কুনোর চেয়ে অনেক উন্নত এবং এটিকে রেল ইঞ্জিনের প্রাথমিক রূপ বলা যায়। গাড়ির প্রতি জনসাধারণের ভীতির জন্য মারডক দিনের বেলায় তার ইঞ্জিনকে বের করতে সাহস করেনি।

নিশি রাতে সবাই যখন গাড় ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল ঠিক সেই সময় মারডক বের করছিল তার ইঞ্জিনকে। কিন্তু ইঞ্জিনের প্রচন্ড শব্দে স্থানীয় সমস্ত মানুষের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। তারা জেগে উঠা দেখে ক্ষুব্ধ আক্রোশে ফুসফুসে শব্দে কুচকুচে কালো বিড়ালের মত কি একটা গনগনে আগুন এবং এক রাশি গাড় ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে এগিয়ে আসছে। দেখামাত্রই শিউরে উঠেছিল সবাই।

কোনো এক শয়তানের কাজ মনে করে তারা ঘরে দরজা বন্ধ করে কাঁপতে শুরু করেছিল। এদিকে ইঞ্জিনটা যখন বড় রাস্তা বেয়ে গির্জার কাছে এসে পৌঁছাল তখন পাদ্রী সাহেবের ঘুম গেল ভেঙে। তিনি ধরে নিলেন দেশের মানুষের মধ্যে অনাচার এসেছে তাই তাদের শায়েস্তা করার জন্য ঈশ্বর প্রেরণ করেছেন শয়তানকে। আর শয়তান মশাল জ্বেলে পথ পরিক্রমা করছেন। ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করতে না পারলে অচিরেই পৃথিবীটা একেবারে ধ্বংস হয়ে যাবে।

একটি মাত্র পথ পরিক্রমা করে মারডক ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু সেই রাতে দেখা সেই ভয়ংকর শয়তানের কথাই আলোচনা করতে লাগলেন সবাই। আর শয়তানটা কোথায় আত্মগোপন করেছে তা জানার জন্য সবাই উদগ্রীব হয়ে রইল। শেষে আবিষ্কৃত হল কাজটা শয়তানের নয় মারডকের। তখন পাদ্রী সাহেব ধরে নিলেই মারডকের দেহে শয়তান ভর করেছে এবং মারডককে শয়তান মুক্ত করতে না পারলে দেশের মানুষের চরম সর্বনাশ হবে। মারডকের পরিনাম কুনোর মতো না হলেও গাড়ি আর চালাতে পারলেন না তিনি। কিন্তু যারা এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করলেন তারা বুঝতে পারলেন ইঞ্জিনের দ্বারা প্রচুর মালপত্রকে বহন করে নিয়ে যাওয়া আদৌ কষ্টসাধ্য কোন ব্যাপার নয়। তাছাড়া অনেক অনেক শক্তিশালী করে গড়ে তোলা যায় ইঞ্জিনকে।

তাই জনগনের রোশ এবং সরকারের রোশকে তুচ্ছ করে গবেষকরা গোপনে গোপনে চালিয়ে গেলেন গবেষণা। কেটে গেল আরো কিছুদিন। এক সময় ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার থেকে লিভারপুল পর্যন্ত পাতা হল রেল লাইন। উদ্দেশ্য ছিল লোহার পাতের অপর দিয়ে একটু সহজে বয়ে নিয়ে যাবে কয়লাকে। সেখানকার কয়লার খনিতে কাজ করতেন এক ইঞ্জিনিয়ার। নাম তার জর্জ স্টিফেনসন। তিনি কর্তৃপক্ষকে জানালেন যদি আর্থিক আনুকূল্য লাভ করেন তাহলে ইঞ্জিনের সাহায্যে তিনি অল্প সময়ে কয়েকশ’ কয়লাকে তিনি যথা সময়ে যথাস্থানে পৌঁছে দিয়ে আসতে পারবেন। শত শত মানুষ এবং শত শত ঠেলাগাড়ির দরকার পড়বে না।

কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখলেন স্টিফেনসন যদি কৃতকার্য হন তবে প্রচুর খরচ বেঁচে যাবে এবং লাভের অংকটা দাঁড়াবে বিশ গুন। তাই নির্দেশ দিলেন স্টিফেনসনকে রেল গাড়ি আনতে এবং কিছু অর্থ বরাদ্দ করলেন। স্টিফেনসন এক সময় গাড়ি তৈরি করে ইঞ্জিনে জুড়ে দিলেন। দিন ও স্থির হয়ে গেল। তার কথাটা রটে গেল চারিদিকে। শত শত টন কয়লাকে বোঝাই করে ছুটবে গাড়ি। দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার দর্শক ছুতে এল সেই অদ্ভুত গাড়ি দেখার জন্য। পথের দু পাশে জনতার ভির একবারে উপচে পড়ল। জথা সময়ে স্টিফেনসন গাড়িটাকে ছাড়লেন। হুস হুস করে ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে এগিয়ে চলল গাড়ি।

পথের জনতাকে সাবধান করে দেয়ার জন্য সামনে লাল নিশান হাতে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলে। কিন্তু গাড়ির গতি ধীরে ধীরে এমন বেড়ে গেল যে ঘোড়া তার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারল না। বাধ্য হয়ে ঘোড়া চালককে পথ ছেরে দিতে হলো। নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই গন্তব্যে স্থানে পৌঁছে গেল গাড়ি। ফেরার পথে দর্শকদের আগ্রহ দেখে স্টিফেনসন বহু মানুষকে গাড়িতে করে নিয়ে এসেছিলেন। গাড়ির এমন তীব্র গতি দেখে সবাই সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। গতির যে একটা আনন্দ আছে তাও সেদিন প্রথমবারের মত মানুষ বুঝতে পেরেছিল।

এমন গতিসম্পন্ন গাড়িকে সেকালে মানুষ কিন্তু সহজে মেনে নিতে পারেননি। ভীত হয়ে উঠেছিলেন প্রতিটি মানুষ। এমনকি পার্লামেন্টের সদস্যরা শংকিত হয়ে উঠেছিলেন। প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন রাস্তায় ইঞ্জিন চলাচল করলে পথের দুপাশের গ্রামগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। রাস্তায় গরু ছাগল কাটা পরবে। পুকুরের পানি দূষিত হয়ে উঠবে এবং মাঠে ফসল ফলবে না।

খনির মালিক এবং স্টিফেনসন এর সর্বনাশা বুদ্ধির জন্য বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল সারাদেশ। দ্বিতীয় বার যাতে এই গাড়িকে স্টিফেনসন বের করতে না পারেন তার জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু গাড়ি চালানো বন্ধ করা যায়নি। ধীরে ধীরে সবাই মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে রেলগাড়ির প্রচলন শুরু হয়েছিল সেই থেকে।

সূত্রঃ ডেইলি বাংলাদেশ

error: Content is protected !!