সোমবার , আগস্ট ১৯, ২০১৯
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

শনির চাঁদ টাইটান হতে পারে দ্বিতীয় পৃথিবী !

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক

আমাদের মহাবিশ্ব রহস্যে ভরা। আর এই রহস্যময় মহাবিশ্বে কতই না অজানা এবং অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটেই চলেছে। আর এ রকম সব অদ্ভুত কিছু দেখার জন্য আমাদেরকে বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না। আমাদের সৌরমণ্ডলেই এরকম অনেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে চলেছে। আমাদের সৌরমণ্ডলের মোট আটটি গ্রহের মধ্যে একটি হচ্ছে শনি যার ৬২টি চাঁদ আছে এবং তাদের মধ্যে সবথেকে বড় হচ্ছে টাইটান। টাইটান পৃথিবী ব্যাতিত এমন একটি স্থান যেখানে বিজ্ঞানীরা বহমান নদী এবং সমুদ্রের সঠিক প্রমাণ পেয়েছেন।

বিজ্ঞানীদের ধারণা এক সময় আমাদের পৃথিবীও টাইটানের মতোই ছিল যার কারণে ওইখানে জীবনের পূর্ণ সম্ভাবনা আছে এমন কি ভবিষ্যতেও মানব বসতি স্থাপন করা যেতে পারে। কিছু বিজ্ঞানীদের মতে, যদি টাইটান শনি গ্রহের পরিক্রমা না করতো তাহলে একটি গ্রহের দরজা পেত। আমাদের পৃথিবীর চাঁদের থেকেও দেড় গুন বর এই চাঁদ। আমাদের সৌরমণ্ডলের দ্বিতীয় সব থেকে বড় চাঁদ টাইটান।

২৫ মার্চ ১৬৫৫ সালে ডাচ এস্ট্রনমার ক্রিচিয়ান হুগেন্স প্রথম টাইটানের খোঁজ পেয়েছিলেন। তিনি এটির নাম গ্রীক এর পৌরানিক যোদ্ধা টাইটানের নাম অনুসারে রাখেন। নাসার বিজ্ঞানী ক্যাসিনি মিশনের সাহায্যে এর অনুসন্ধান করেন। যা থেকে জানা যায় এর মধ্যে লিকুইড মিথেনের সমুদ্র আছে। আমাদের পৃথিবীতে যেমন পানি চক্র বিদ্যমান ঠিক তেমনি টাইটানে মিথেন চক্র কার্যকর আছে। এই চাঁদটির ভূ-পৃষ্ঠের ওপরেই যে শুধু মিথেন আছে এটা নয়। ভূপৃষ্ঠের নিচেও মিথেন আছে। ওইখানে পৃথিবীর মতোই আরাবিয়ান ট্রেজার্সের মতই বিশাল বালুর টিলা মজুদ আছে শুধু পার্থক্য এটাই এগুলো জমে থাকা হাইড্রোকার্বন দিয়ে তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মতে এই টিলাগুলো এক থেকে দুই কিলোমিটার চওড়া আর প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু। পৃথিবীর মতো এতেও ৩টি ভাগ করা যায়। রিসার্চ থেকে এটা জানা যে, এর কোর যা এখনো গরম আছে। টাইটানে বৃষ্টি হয় যা হাজার বছরে একবার হয়ে থাকে। টাইটানে সাধারনত মিথেনের বৃষ্টি হয়ে থাকে। যখন মিথেন বৃষ্টি রূপে ঝরতে থাকে তখন সেই দৃশ্যটি মুগ্ধ করে দেয়ার মত। কারণ এর আকর্ষণ শক্তি পৃথিবীর তুলনায় অনেকটাই কম। আর যার কারণেই বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আকাশ থেকে মাটিতে ধীরে ধীরে নেমে আসে। মিথেন পানির থেকে হালকা হওয়ায় আর টাইটানে কম গ্রাভিটি হওয়ার কারণে এই মিথেনের আকার বেশ বড় হয়ে যায় যা আকারে এক একটা ফুটবলের সমান হবে।

টাইটানের ভূপৃষ্ঠের নিচেই পানির সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। বিজ্ঞানিরা মনে করেন টাইটান ভীষণ রহস্যময়। আর সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে ভবিষ্যতে এটা মানব জাতির দ্বিতীয় ঘর হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এটাও মনে করেন টাইটান এবং তার বায়ুমন্ডলের খোঁজ আমাদের ডেড স্পেস এক্সপ্লরেসনে অনেকটাই সাহায্য করবে। এর বায়ুমণ্ডল নাইট্রোজেন গ্যাস দ্বারা তৈরি। তার মধ্যে ৯৮.৪ শতাংশ নাইট্রোজেন, ১.৪ শতাংশ মিথেন আর বাকি হাইড্রোজেন কার্বন মনোক্সাইডের মতো গ্যাস পাওয়া যায়। টাইটানের বায়ুমণ্ডল তার ভূ-পৃষ্ঠ থেকে ৯৭৫ কিলোমিটার ওপর পর্যন্ত বিস্তৃত।

টাইটানের বায়ুমণ্ডলের বায়ুর চাপ পৃথিবীর তুলনায় ৪৫ শতাংশ বেশি। বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব পৃথিবীর তুলনায় অনেক কম। ফলে মাধ্যাকর্ষনের কারণে আপনি টাইটানে ডানার মতো কোনো কিছু ব্যবহার করে অতি সহজেই ঘুরতে পারবেন। এর বায়ুমন্ডলে পৃথিবীর মতোই মেঘ আর মেঘের গর্জন ওইখানে আপনাকে পৃথিবীর মতোই অনুভূতি দেবে। ক্যাসিনি মিশন দ্বারা ক্যাপচার ছবিতে টাইটানের ভূ-পৃষ্ঠে নদীর মতোই আকৃতি দেখতে পাওয়া গেছে। যেটা উত্তর মেরু থেকে শুরু হয় ৮০০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে সমুদ্রে গিয়ে মিশেছে। টাইটানের এই নীল নদীতে পানির পরিবর্তে ইথেন আর মিথেন বয়ে চলেছে। পৃথিবীর বাইরে কোনো বহমান নদীর দেখতে পাওয়ার এটাই একমাত্র ঘটনা। ক্যাসিনি মিশন সফল হওয়ার পূর্বে আমরা টাইটানের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতাম না। টাইটানের বায়ু মন্ডল এক ধরনের কুয়াশাতে আচ্ছন্ন থাকে যার কারণে এর ভূ-পৃষ্ঠকে দেখতে পাওয়া খুব কঠিন একটি কাজ। টাইটানের বায়ুমন্ডল মূলত নাইট্রোজেন দিয়েই গঠিত। ছোট ছোট যৌগ পদার্থ মিলে এতে মিথেন আর ইথেনের মেঘ ও নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ কুয়াশার তৈরি করেছে। যার কারণে দূর থেকে এর পৃষ্ঠকে দেখতে পারা কঠিন একটি কাজ আর এই কারণে এক পার্সেন্ট সূর্যের আলোয় এর ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

ক্যাসিনি হুয়গেন্স মিশন নাসা, ইউরপিয়ান স্পেস এজেন্সি আর ইতালি স্পেস এজেন্সির যৌথ উদ্যোগে প্রেরিত একটি অভিযান। যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে শনি গ্রহ এবং এর উপগ্রহগুলোকে নিয়ে গবেষণা করা। অভিযানে ব্যবহার করা এক্সপ্রেস ক্রাফটটির মূল অংশটি হচ্ছে নাসা নির্মিত ক্যাসিনি অরবিটার যা বিখ্যাত ইতালিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্যাসিনি এর নাম অনুসারে রাখা হয়েছে এবং ইউরিপিয়ান স্পেস এজেন্সি দ্বারা নির্মিত উগ্যান্স প্রফটি ডাচ জ্যোতিষবিজ্ঞানী গনিতবিদ এবং পদার্থবিজ্ঞানী ক্রিসচিয়ান উগেন্স এর নাম অনুসারে নামকরণ করা হয়। ১৯৯৭ সালে এই মিশনটিকে লঞ্চ করা হয়। ক্যাসিনি অরবিটার এবং হুইকেন্স ল্যান্ডার হিসেবে কাজ করে।

১৯৯৭ সালে লঞ্চ করার সাত বছর পরে ১ জুলাই ২০০৪ এ ক্যাসিনি মিশনটি শনি গ্রহের কক্ষে প্রবেশ করে। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে ক্যাসিনি থেকে হুগেন্স প্রুফটি টাইটানের উদ্দেশে আলাদা হয়ে যায়। তারপর ১৪ জানুয়ারি ২০০৫ এ হুগেন্স টাইটানের বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে আর প্রায় ২ ঘন্টা ৩০ মিনিট পর সেটি টাইটানের মাটিতে এসে নামে। এতটা সময় মহাকাশে থাকা অবস্থায় এবং টাইটানের বায়ুমন্ডলে প্রবেশ করার সময় এটি টাইটানের বিভিন্ন স্থান বিভিন্নভাবে অধ্যায়ন করে। ওই তথ্য থেকে আমরা টাইটানের সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পেরেছি।

ক্যাসিনির দেয়া তথ্য থেকে এটা জানা গেছে এর বায়ুমণ্ডলে হাইড্রজেনের অনুর প্রভাব উপর থেকে নিচের দিকে হয়ে থাকে। ভূমিতে আসতে আসতে এই অনু উধাও হয়ে যায়। এই রিসার্চে বলা হয়, আগে এমনটা অনুমান করা হয়েছিলো এর বায়ুমণ্ডলে হাইড্রজেনের মাত্রা সব জায়গায় একই রকম হবে কিন্তু রেসাল্ট ভীষণ অবাক করার মত। এতে হাইড্রোজেনের মাত্রা নিচের দিকে কমতে থাকে আর ভূমিতে আসতে আসতে সেটা শেষ হয়ে যায়। এই তথ্যকে ভুল বলা যাবে না কারণ বারবার চেক করার পরও একই ফলাফল এসেছে। এখন প্রশ্ন এটাই হাইড্রোজেন কোথায় চলে যাচ্ছে?

কিছু বিজ্ঞানের ধারণা এটা টাইটানে বসবাস করা মিথেন দ্বারা বেঁচে থাকা জীবের কারণে হতে পারে কিন্তু এরকম কোন জীব আছে এমন কোন প্রমাণ এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আর এ কারণেই টাইটানের মাটিতে এক আলাদা প্রকারের জীবের কল্পনা করা হচ্ছে। যেমন আমাদের পৃথিবীতে জলের মধ্যে জলজ প্রাণী বসবাস করে ঠিক তেমনি টাইটানেই মিথেনের নদীতে ম্যাথিনুজেন জীবনের কল্পনা করা হচ্ছে।

নাসার বিজ্ঞানীদের অনুমান যদি সত্যি হয় তাহলে তারা এসিটাইলেনকে খাবার আর হাইড্রোজেনকে নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য ব্যবহার করতে পারে, যেমনটা পৃথিবীর পৃথিবীর প্রাণিরা গ্লুকোজ আর অক্সিজেন এর গ্রহণ করে থাকে। পৃথিবীর জীব কার্বন ডাই অক্সাইড ত্যাগ করে, ঠিক তেমনি হয়তো টাইটানের জীব মিথেনের উৎপাদন করে থাকে। টাইটানের বায়ুমণ্ডল থেকে পাওয়া তথ্য দেখে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। ওইখানে ম্যাথিনুজেন জীবন পাওয়া যেতে পারে। হুইগেনে জীব বা জীবের কোন খোঁজ করতে পারবে এমন কোন প্রযুক্তি নেই। এর জন্য এটা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না ওইখানে আছে নাকি নেই। সেটা এখন অনুমান করা ছাড়া আর বোঝা সম্ভব নয়।

টাইটানের ভূমিতে হাইড্রোজেন আর এসিটাইলেনের অনুপস্থিতির কারণ কোনো নন বায়োলজিক্যাল কম্পনেন্সকে দেয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে এমন অজানা কিছু হাইড্রোজেন আর এসিটাইলেনকে পুনরায় মিথেনে পরিবর্তন করছে। এর মাইনাস ১৮৬ ডিগ্রী টেম্পারেচারে রাসায়নিক এ প্রক্রিয়ায় মহান কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং এর থেকে কম নয়। বিজ্ঞানীদের এর প্রতি এতটা উৎসাহিত হওয়ার আরেকটি কারণ রয়েছে, বিলিয়ন বছর পূর্বে পৃথিবী বায়ুমণ্ডলও হয়তো ঠিক এ রকমই ছিল। আর হয়তো এভাবে পৃথিবীতে জীবনের উৎপত্তি হয়েছিলো।

এখানে মজুত কার্বনিক পদার্থ সূর্যের সাথে মিশে রাসায়নিক ক্রিয়ার মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন রকমের পরিবর্তন করতে সক্ষম। এটি নিয়ে রিসার্চ করার আরও একটি কারণ হচ্ছে বিলিয়ন বছর পরে পৃথিবীর সূর্যের তাপমাত্রা অধিক হয়ে যাওয়ার কারণ এই পৃথিবীতে বসবাস করা সম্ভব হবে না। তখন টাইটান মানুষ বসবাসের উপযুক্ত হবে। আর টাইটানে মানুষ আরও কোটি বছর পর্যন্ত দ্বিতীয় ঘরে বসবাস করতে পারবে। শুধু এমন যেন না হয় ওইখানে আমরা যাবার পূর্বে ওইখানেই তেমন কোনো জীবের যেন সৃষ্টি না হয়ে যায় যাদের সাথে আমাদের যুদ্ধ করার প্রয়োজন পড়ে।

নাসা এই উপগ্রহে সবথেকে উঁচু পাহাড়ের খোঁজ পেয়েছে যার উচ্চতা ৩৩৩৭ মিটার। এটিরও খোঁজ ক্যাসিনির সাহায্যে করা হয়েছে। এতে প্রাকৃতিক সম্পদের পর্যাপ্ত ভান্ডার আছে। সাড়ে তিন কোটি লোক খুব সহজেই এখানে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে পারবে। এই চাঁদের সাথে পৃথিবীর মিল রয়েছে। পৃথিবীর মতোই টাইটানের বায়ুমণ্ডল আছে যা রেডিয়েসনের হাত থেকে বাঁচাতে সক্ষম।

নাসা একটি এনিমেটেড ভিডিও পাবলিশ করে যেখানে দেখানো হয়েছে কিভাবে শেষ সময়ে ক্যাসিনি মিশন ৭৭০০০ মাইল প্রতি ঘন্টার গতীতে শনির বুকে বিলীন হয়ে গেল। এ ভাবেই নাসার ক্যাসিনি মিশন শেষ হলো। ক্যাসিনি এখনো পর্যন্ত চার লক্ষ তিপান্ন হাজারের বেশি পিকচার তুলেছেন আর এটা চার দশমিক নয় বিলিয়ন মাইল পথ অতিক্রম করেছে। নাসা ২০২০ সালে টাইটানে একটি রোবোটিকস মিশন পাঠাতে যাচ্ছে। যা ওইখানে জীবনের কোনো খোঁজ আছে কি না তা পরীক্ষা করে আমাদের নিশ্চিত করবে।

সূত্রঃ ডেইলি বাংলাদেশ

error: Content is protected !!