বুধবার , নভেম্বর ১৪, ২০১৮
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

কলকাতার স্টার জলসা চ্যানেল বনাম  এনড্রয়েড ফোন ও কিছু কথা 

 মোঃ ইউনুস আলি মিয়া,  সিনিঃ এএসপি
ছোট বেলায় ৫ম শ্রেনীতে পড়ার সময় বাংলা শিক্ষক এর নিকট একটা গল্প শুনেছিলাম, যা আজও মনে রেখেছি । ৫ম শ্রেনীতে পড়ার সময় সাধারনত আমাদের বাংলা ২য় পত্রের পরীক্ষার রচনা হিসেবে গরু,নদী ,আমাদের বিদ্যালয় বা উড়োজাহাজ থাকতো। যার যার পছন্দ মত আমরা রচনা লিখেছি।গল্পে শিক্ষক বললেন একজন ছাত্র সব সময় গরু রচনা পরীক্ষায় লিখতো এবং ভাল লিখতো। শিক্ষক এতে বিরক্ত হতো এবং বলতো ছেলেটার মাথার ভিতর গরু ঢুকে গেছে। এর পরের  পরীক্ষায় শিক্ষক গরু রচনা বাদ দিয়ে নদী রচনা দিলেন। ঐ ছাত্র নদী রচনা ভাল লিখেছে কিন্তুু গরুর কথা সে ভুলে যায় নাই। ঠিকই সে নদী রচনার মাঝ খানে গরুর সুন্দর বর্ননা দিয়ে গরুকে গোসল করার জন্য নদীতে নামিয়ে দিল ।সে লিখেছে নদীর পাড়ে গরু ঘাস খায়। গরু ঘাস খেয়ে প্রচুর দুধ দেয় ইত্যাদি। এবার শিক্ষক আরো বিরক্ত হলো, তার পরের পরীক্ষায় শিক্ষক গরু,নদী রচনা বাদ দিয়ে উড়োজাহাজ রচনা সহ অন্য দুইটি রচনা দিয়েছিল কিন্তুু এবার ঐ ছাত্র উড়োজাহাজ রচনা লিখেছে এবং আবার মাঝ খানে লিখেছে উড়োজাহাজ  থেকে গরু গুলি অনেক ছোট দেখা যায়। নদীর পারে গরু ঘাস খায়। রাখাল নদীতে গরু গোসল করায়। কি চমৎকার দৃশ্য উড়োজাহাজ থেকে দেখা যায়।শিক্ষক এত বিরক্ত হলো যে ছেলেটার মাথা থেকে গরু সরানো গেল না।
                    এই গল্পটা বলার কারন, অন্য প্রসঙ্গ আছে । আমাদের দেশে বেশ কয়েক বছর কলকাতার ষ্টার জলসা, জি বাংলা,কালার বাংলা নামে কয়েকটি বাংলা চ্যানেলে  ধারাবাহিক সিরিয়াল মা ,স্ত্রী, ছেলে মেয়েদের, এমন কি কিছু মধ্যে বয়সী ও বৃদ্ধ বয়সী পুরুষদের মাথার ভিতর ঐ চ্যানেল গুলি এমন ভাবে ঢুকে আছে যে, ঐ ছেলেটার গরু রচনার মত।সন্ধ্যা হলেই টিভির সামনে সেজে-গুজে নাস্তা-পাস্তা খেয়ে বসে পড়ে। এমনও দেখা যায় যে বাসায় ছোট ছেলে মেয়ে আছে তারা কান্না কাটি করছে কিন্তুু মায়ের সেই দিকে কোন খেয়াল নাই।বাচ্চাটা তার মায়ের একটু আদর পাওয়ার জন্য কাঁদছে। কিন্তুু মাতো ষ্টার জলসায় “কে আপন কে পর” বা “ভজ গোবীন্দ” কিংবা “খোকা বাবু” সিরিয়াল নিয়ে এত ব্যস্ত যে তার কোন সময়ই নাই। স্বামী হয়ত সারাদিন অফিসে কাজ করে বাসায় ফিরেছে, স্ত্রীর খেয়াল হয় না যে ঘরের দরজা খোলা বা স্বামী সারা দিন পর বাসায় এসেছে তাকে একটু চা বানিয়ে দিবে বা কোন কিছুর প্রয়োজন আছে কি না তার জন্য কাছে যাবে, তারতো একটাই খেয়াল সিরিয়াল জমে গেছে। উঠতে পারছে না। ঐ সিরিয়াল গুলিতে বাচ্চা ছেলেরা সুন্দর অভিনয় করে, তা দেখার জন্য আমাদের ছেলে মেয়েরা লেখা-পড়া বাদ দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে।  লেখা-পড়া গোল্লায় যাক মায়েরা মনে করে  সিরিয়ালটা তো দেখে নেই। কিছু কিছু মধ্য বয়সী ও বৃদ্ধারাও ঐ সিরিয়াল এর প্রতি অতি আসক্ত হয়ে পড়ছে। বৃদ্ধারা হইতোবা সময় কাটানোর জন্য দেখে কিন্তুু মধ্য বয়সী তাদের মাথায়ও এই সিরিয়াল গুলি ঢুুকে পড়েছে, কিন্তুু এই সিরিয়াল হতে আমরা কি শিক্ষা পাই। আমি এত জ্ঞানী ব্যক্তি নই। বিশ্লেষন করে বলতে পারবো না তবে যতটুকুু মনে হয় পরিবারের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ সৃষ্টি করা ছাড়া কোন কিছু শিক্ষার আছে, বলে আমার মনে হয় না।আমাদের হয়ত অনেকের মনে আছে, কয়েক বছর আগে পাখি ক্রেজে কয়েক জন যুবতী আতœহত্যা করে মারা যায়।কারণ পাখির পড়া ড্রেস কিনতে না পেরে মেয়ে গুলি আতœহত্যা করে।তা হলে আমরা সিরিয়াল হতে কি পেলাম।পশ্চিম বঙ্গের মাননীয় মুখ্য মন্ত্রী মমতা ব্যার্নাজী নিজেই একটি মিডিয়া সভায় পরিচালকদের বলেছেন ভাল গল্প নিয়ে সিরিয়াল করেন।পরিবারের মধ্যে ঝগড়া-ঝাটি ও দুই তিনটি বিয়ে করা ছাড়া গল্পে কিছুই থাকে না । খারাপ জিনিস বাদ দিয়ে ভাল কিছু করেন ।এটা সত্য “সব সময় সত্যের জয় হয়।”
                কয়েকদিন আগে ফেসবুকে একটি ছোট গল্প পড়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি । একটি পরিবারে স্বামী স্ত্রী ও ৫ বছরের একটি ছোট ছেলে সহ পরিবারটি খুব সুখেই আছে। ছেলেটি সরকারী স্কুলের প্রথম শ্রেনীতে পড়ে। মা সেই স্কুলের শিক্ষিকা এবং বাবা সরকারী চাকুরীজিবী । তাদের স্বামী স্ত্রীর দুই জনের ২ টি সুন্দর এনড্রয়েড (স্মার্ট) ফোন আছে । দুই জনেই ফোন খুব যতœ করে এবং সব সময় মুছে চকচক করে রাখে । তাদের ছেলেটি ফোন ধরতে পারে না । সে শুধু দেখে আর মনে মনে ভাবে তার বাবা মার কাছে ফোনই সবচেয়ে প্রিয়। সে প্রিয় নয় । ছেলেটি প্রায়ই লক্ষ্য করে তার মা ফোনে হয়ত তার বাবার সাথে চ্যাটিং করছে বা বন্ধু বান্ধবের সাথে কথা বলছে।তার খাওয়ার সময় হলেও মায়ের কোন খেয়াল নেই বা তার সাথে কোন খেলাও করে না বা আদরও করে না। বাবা অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে, সেও ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরে। ছেলেটির তখন ইচ্ছা করে মা ও বাবার সাথে যদি খেলা করতে পারতাম বা ফোনে যদি গেমস্ খেলতাম কত না মজা হতো। বাবা যদি আমাকে আদর করে কোলে নিতো। কিন্তুু বাবাতো বাসায় থাকলে ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ছেরেটির মনে খুব কষ্ট। ইতি মধ্যে ছেলেটির বার্ষীক পরিক্ষা শুরু হয়েছে। বাংলা পরীক্ষায় রচনায় “আমার ইচ্ছা” (গু ডযরংয) রচনা থাকায় ছেলেটি আমার ইচ্ছা রচনা অতি চমৎকার ও আবেগময় ভাষায় লিখেছে। আমার ইচ্ছা আমি এনড্রয়েড ফোন হবো। তাহলে হয়ত আমার পিতা মাতা আমাকে খুব যতœ করবে আদর করবে। আমি তাদের সাথে গেমস্ খেলতে পারবো। আমাকে সব সময় পরিস্কার পরিছন্ন রাখবে। বাবা প্রতি দিন ঘুমানোর আগে এনড্রয়েড ফোন খুব সুন্দর ভাবে বালিশের পাশে রেখে ঘুমায় কিন্তুু আমি একদিনও বাবার সাথে তার বুকের ভিতর জড়িয়ে ঘুমাতে পারিনি। আরো অনের কষ্ট নিয়ে সুন্দর সুন্দর কথা লিখেছে ।
ছেলেটির মা পরীক্ষার শেষে একদিন রাত্রে খাতা দেখছে, এমন সময় বাবা অফিস থেকে বাসায় ফিরে জিজ্ঞাসা করলো কি করছো ? স্ত্রী জবাব দিলো খাতা দেখছি। আর কয়েকটা আছে তুমি ফ্রেশ হয়ে নেও।স্বামী ফ্রেশ হয়ে সোফায় বসে এনড্রয়েড ফোনে ফেসবুক দেখছে। এমন সময় দেখলেন তার স্ত্রী কাঁদছেন । স্বামী বললো কাঁদছো কেন? তখন স্ত্রী বললো দেখো প্রথম শ্রেনীর পরীক্ষায় রচনা এসেছে “আমার ইচ্ছা” একটা ছেলে খুব ভাল লিখেছে । স্বামী বললো কি লিখেছে ? “আমার ইচ্ছা” লিখেছে। তাহলে তুমি কাঁদছো কেন ? স্ত্রী বললো ছেলেটা এনড্রয়েড ফোন  রচনা লিখেছে। “আমি এনড্রয়েড ফোন হবো। তাহলে আমার বাবা মা আমাকে আদর যতœ করবে। সব সময় কাছে থাকতে পারবো । গেমস্ খেলতে পারবো । বাবা মা তাদের ফোন গুলো পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখে এবং সময় মত চার্জ দেয়। বাবা ঘুমানোর সময় ফোন খুব যতœ সহকারে  বালিশের কাছে রাখে। আমি একদিনও বাবার সাথে তার কোলে ঘুমাতে পারি নাই” ইত্যাদি। তখন স্বামী বললো ছেলেটির নাম কি ? তখন স্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বললো, ওগো আমাদের ছেলে। তখন বাবা হতবাক  হয়ে পাশে বসে থাকা ছেলের দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে, মনে মনে ভাবলো হাইরে ছেলেটা ভালবাসা কাকে বলে শিখিয়ে  দিলো।
 গত ২১ শে এপ্রিল বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় চট্রগ্রামের একজন ছাত্রী বিশ্ব উদীওমান ১০ তরুণ নেতার তালিকায় তার নাম দেখলাম ও ভাবলাম বাংলাদেশের একজন ছাত্রীর প্রতীভা যা দেশের মুখ উজ্জল করেছে। তার নাম তানজিল ফেরদৌস। চট্রগ্রাম হালি শহরের মেয়ে ও এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থণীতির ছাত্রী। সে সমাজের পিছিয়ে পড়া দুস্থ্য, অসহয়, নারী ও শিশু এবং মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তার মাও চট্রগ্রাম সিটি করর্পোরেশনের দুই বার নির্বাচিত কাউন্সিলর। বার্মার সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্যাতিত বাংলাদেশে আসা রহিঙ্গাদের সেবায় তানজিল নিজেকে এমন ভাবে জড়িত করে কাজ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যে তা লিখে শেষ করা যাবে না। তারই স্বৃকৃতি স্বরুপ আমেরিকা কর্তৃক বিশ্বের উদীয়মান ১০ তরুন নেতার তালিকায় নাম লিখিয়েছে। তাকে আগামি ২রা মে ইর্মাজিং ইয়াং লিডারস অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হবে। বিশ্বের আরও ৯ টি দেশের তরুন নেতাদেরও এই পুরস্কার দেওয়া হবে।তানজিনের জন্য আমাদের গর্ব করা উচিত। কারন সে বাংলাদেশের মুখ উজ্জল করেছে।হয়ত একদিন দেখা যাবে এই তানজিল চট্রগ্রামের নেতৃত্ব দিবে। তানজিলের মা সাংবাদিকদের সুন্দর কথা বলেছেন । আমাদের দেশের মা বাবারা সন্তানদের ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিসিএস অফিসার বানাতে ব্যস্ত হয়ে পরে। কিন্তুু সে তার ছেলে মেয়ে দের বলেছেন তোমাদের যে কাজ ভাল লাগে তাই করো।
                   এই লেখাটার কারন আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মাথায় শুধু পড়াশুনা শেষ করে চাকরীর চিন্তা থাকে। কিন্তুু তারা ভাবে না  কতোজন ছাত্র ছাত্রী ডাক্তার, পোকৌশলী ও বিসিএস অফিসার হবে। সমাজের জন্য কাজ করেও তারা যে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে তা ভাবে কিনা জানি না। এখন আমাদের দেশের অধিকাংশ মা-বাবা তাদের ছেলে মেয়েদের ডাক্তার, প্রকৌশলী, বিসিএস অফিসার বানানোর জন্য কোমর বেধে নেমে পড়ে। কোচিং এর পর কোচিং , গাদা গাদা বই-পত্র ছাত্র-ছাত্রী দের উপর চাপিয়ে দিয়ে ছাত্র-ছাত্রী দের মনের উপর চাপ সৃষ্টি করে।ঘন্টার পর ঘন্টা কোচিং সেন্টারের সামনে কাজ-কর্ম ফেলে বসে বসে গল্প করে। এতে অনেকের সংসারও ভেংগে গেছে বলে জানা যায়।আমরা একবার ও ভাবিনা আমাদের ছেলে মেয়েরা কোন বিষয়ে পারদর্শী। সে কি করতে চায়। তাদের মতামতের কোন পাত্তা দেই না । আরে বাবা, ছেলেটা যদি ভাল ক্রিকেট খেলে তাকে এই দিকেই যেতে দাও ,বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চায়, তাকে সেটাই হতে দাও।  কিংবা সে ভাল গান গাইতে পারে, তাকে সেই দিকেই থাকতে দাও, অথবা তার ভিতর যদি ভাল নেতৃত্বের গুন থাকে, তাকে সেই দিকেই থাকতে দাও। সে যদি ভাল ব্যবসায়ী বা সাংবাদিক হতে চায়, তাকে সেটাই হতে দাও। ছেলে মেয়েদের ইচ্ছার প্রতি আমাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অনুরোধ করি বাবা-মায়েদের মাথা থেকে ভুতটা বের করে আনুন। দেখবেন আপনার ছেলে মেয়েরা একদিন আপনার তথা দেশের মুখ উজ্জল করেছে। যে ভাবে তানজিল ফেরদৌস দেশের তথা মা বাবার মুখ উজ্জল করেছে।
                         ছোট বেলায় স্যারের সেই গরুর রচনার ভাব অর্থ না বুঝে মজা পেয়েছি,অনেক হেসেছি। কিন্তুু আজ বুজতে পারছি স্যারের সেই গল্পের অর্থ। আমরা এত আবেগ প্রবণ যে কোন কাজের পরিনাম না ভেবে করে থাকি এবং এমন কিছু বিষয় আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে ফেলি যে মাথা থেকে সেটা আর বের করার চেষ্টা করি না । আমার এই লেখায় যদি কোন ভুল ত্রুটি থাকে বা কারো মনে যদি এতটুকু কষ্ট হয় তবে আমাকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কারন আমি এতো বড় লেখক বা জ্ঞানের অধিকারী নই। আপনাদের শিক্ষা দেওয়ার  মতো ধৃষ্টতা আমার নেই। এটা আমার নিজস্ব মতামত।সবাই  ভাল থাকবেন।