সোমবার , ডিসেম্বর ১০, ২০১৮
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

পশ্চিমা হামলা: সিরীয় জনগণকে পরিত্যাগ করেছে বিশ্ব?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের রাসায়নিক হামলায় নিহত বেসামরিক নাগরিকদের সর্বোচ্চ যে সংখ্যা পাওয়া যায় তা ৪ হাজারের বেশি নয়। সিরিয়ার দীর্ঘ সাত বছরের গৃহযুদ্ধে নিহত মানুষের সংখ্যার তা এক শতাংশেরও কম। এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা সিরীয় শাসকের বিরুদ্ধে দুইবার হামলা চালিয়েছে। প্রথমবার ২০১৭ সালের এপ্রিলে খান শাইখৌনের সারিন হামলার পর। আর শুক্রবার (১৩ এপ্রিল) হামলা চালানো হয় গত সপ্তাহে দৌমাতে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর রাসায়নিক বোমা নিক্ষেপের অভিযোগে।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাথিস শুক্রবার রাতে বিচ্ছিন্ন এসব হামলাকে ‘ওয়ান-টাইম শট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় সিরিয়ার জনগণকে পরিত্যাগ করেছে বিশ্ব। রাশিয়া, ইরান ও হেজবুল্লাহ’র সহযোগিতায় সিরীয়রা নিজেদের শাসকদের হাতে নিহত হতে পারে। এই হত্যাকাণ্ড যেকোনও উপায়ে হতে পারে, বেশিরভাগ সময় যা রাসায়নিক অস্ত্র দ্বারা ঘটছে।

খুব কম সময়েই যখন নিজেদের বাড়িতে গ্যাসের হামলায় নিহত শিশুদের ছবি পশ্চিমা টেলিভিশনের পর্দায় উঠে আসে তখন প্রতীকী অবস্থান নেওয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বা সত্যিকার কোনও পরিকল্পনা নেওয়া হয় না এই যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে এবং সিরীয় প্রেসিডেন্ট আসাদকে জবাবদিহীতায় রাখতে।

শুক্রবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ থেকে সিরিয়ায় শতাধিক ক্রজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল সিরিয়ার ৮টি স্থাপনা, যেগুলো রাসায়নিক অস্ত্র উৎপাদনে সম্পর্কিত বলে এসব দেশের দাবি। এসব স্থাপনার মধ্যে একটি হচ্ছে ডুমাইর বিমানঘাঁটি, যেখান থেকে এমআই-এইট হেলিকপ্টার গত শনিবার ক্লোরিন ও সারিন গ্যাস নিয়ে হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এখন পর্যন্ত এটা স্পষ্ট নয় রাশিয়ার সেনাবাহিনী আগেই কেমন ধরনের সতর্কতা পেয়েছে এসব লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে। কিন্তু কোনও সন্দেহ নাই যে সিরীয় বাহিনী এসব স্থাপনা থেকে হামলার পূর্বেই গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম সরিয়ে নিতে পেরেছে।

সাত বছরের বেশি সময়ের যুদ্ধে সিরীয় শাসকরা নিজেদের সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। আর ২০১৩ সালে যখন রাসায়নিক অস্ত্র কনভেনশনে স্বাক্ষর করার পর থেকে নিজেদের রাসায়নিক অস্ত্রের সামর্থ্য অর্গানাইজেশন ফর দ্য প্রিভেনশন অব কেমিক্যাল উইপন্স টিমের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে আরও বেশি দক্ষতা দেখিয়েছে। শুক্রবার রাতের হামলার সময় সিরিয়া এই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু এসব রাসায়নিক অস্ত্র এখনও সিরিয়ার হাতে রয়েছে, পুনরায় তা ব্যবহার করা হতে পারে।

রাসায়নিক হামলা পুনরায় না চালানোর কোনও কারণ নেই আসাদের। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন হামলাটি সাজানো হয়েছে তাকে এবং তার সমর্থকদের জানানোর জন্য যে, ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে কোনও চ্যালেঞ্জিং প্রবণতা বা সিরিয়া ও রাশিয়াকে দমানোর উদ্দেশ্য ছাড়াই। এমন কোনও লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়নি যাতে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা বা বোমা হামলার সামর্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

গত সাত বছরে পশ্চিমারা সিরিয়ার বিমান বাহিনী ও অস্ত্রঘাঁটিতে আরও বিস্তৃত হামলা চালাতে পারত। বিদ্রোহীদের ছিটমহলগুলোর আকাশসীমাকে নো ফ্লাই জোন হিসেবে ঘোষণা করা যেত। এসব স্থানে প্রতিদিনি বাড়িঘর, স্কুল ও হাসপাতালে সিরীয় বাহিনী বোমা হামলা চালানো হয়। আসাদকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের মুখোমুখি করা হতো সবচেয়ে বড় হুমকি।

২০১৫ সালে সেপ্টেম্বরের আগে সিরিয়ায় রাশিয়া যুদ্ধবিমান মোতায়েনের আগেই এসব পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেত। এমনকি এরপরেও যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা এমন পদক্ষেপ নিতে পারত। সিরিয়ায় রাশিয়ার সেনা উপস্থিতি কম এবং আকারে ছোট। রুশ সেনাবাহিনী দেশটিতে কার্যকর রয়েছে কারণ বাকিরা সিরিয়ার জনগণকে পরিত্যাগ করেছে।

সরাসরি কৌশলগত বা সামরিক সাফল্যের আসাদ রাসায়নিক হামলা চালাননি। ছিটমহলে বসবাসকারী বিদ্রোহীদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্যও করেননি।

অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক অবাক হন, কেন আসাদ এই রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি নিচ্ছেন। এজন্য ধন্যবাদ পেতে পারে রাশিয়া ও ইরান। এসব স্থানে হামলা চালানোর মতো যথেষ্ট আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষকে বেজমেন্টে পুরো পরিবারকে শ্বাসরোধে হত্যা করে আসাদ ত্রাস সৃষ্টি করতে চাইছেন।

পশ্চিমা হামলার ধরনের কারণে আসাদের হয়ত রাসায়নিক অস্ত্রের কিছুটা ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু পুনরায় এমন হামলা চালানোর জন্য যথেষ্ট সরঞ্জাম রয়েছে। হামলার স্থান থেকে অন্যত্র তা এরই মধ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

শুক্রবারের রাতের হামলার নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তাদের এই হামলার নির্দেশে ভয়াবহ দুর্দশা সৃষ্টিকারী সিরিয়া যুদ্ধের কোনও পরিবর্তন ঘটাবে না। এটা ফাঁকা কোনও পদক্ষেপ ছাড়া কিছুই নয়। পশ্চিমারা কিভাবে সিরিয়ার জনগণকে পরিত্যাগ করেছে সেটির একটি উদাহরণ।