সোমবার , ডিসেম্বর ১০, ২০১৮
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

উৎসবের অপেক্ষা

নিউজ ডেস্ক

রাত পোহালেই কেবল নতুন একটি দিন নয়, শুরু হচ্ছে নতুন একটি বছর। পহেলা বৈশাখের হাত ধরে আসছে বাঙালির নববর্ষ। আজ শুক্রবার চৈত্র সংক্রান্তির মধ্য দিয়ে বিদায় নিয়েছে পুরনো বছর। আগামীকাল শনিবার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হবে নতুন বছর ১৪২৫ বঙ্গাব্দের। ইতোমধ্যেই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নববর্ষ উদযাপনের সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ হয়েছে। এখন অপেক্ষা উৎসবের। প্রস্তুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। শুধু নিরাপত্তা প্রদানই নয়, পুলিশ বাহিনীরও রয়েছে উৎসবের নিজস্ব আয়োজন।

পহেলা বৈশাখে পুরো রাজধানী হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। অলিগলি, ময়দান, পার্ক, সড়ক হয়ে ওঠে একেকটি উৎসবস্থল। ব্যপ্তি-পরিচিতিতে পার্থক্য থাকলেও তাতে আনন্দের, প্রাণের জোয়ারের থাকে না তেমন তারতম্য। ভোরে রমনার বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে বাঁশিতে ভোরের রাগালাপের মধ্য দিয়ে যে বর্ষবরণ শুরু হবে, তা ছড়িয়ে যাবে পুরো নগরীতে, পুরো দেশে। সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বেরোবে বিশ্ব ইনট্যানজিবল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে রয়েছে সুরের ধারার বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। সকাল পৌনে ৮টায় ধানমন্ডির ২/এ সড়কে সীমান্ত স্কয়ারের উল্টোপাশে বরেণ্য শিল্পীদের অংশগ্রহণে সংগীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে বরণ করে নেওয়া হবে নতুন বছরকে। মীনা ট্রাস্টের এ আয়োজনে সহযোগিতায় রয়েছে মীনা বাজার। বিকাল ৫টার মধ্যে উন্মুক্ত স্থানের সব অনুষ্ঠান শেষ হলেও ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলবে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের বর্ষবরণ। রমনায় ঢাকা মহানগর পুলিশেরও নিজস্ব আয়োজন রয়েছে।

এছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরও রয়েছে দিনব্যাপী নিজস্ব আয়োজন। প্রতিটি আয়োজন ঘিরেই থাকছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠানটি হয় রমনা বটমূলে–ছায়ানটের আয়োজনে। গানে গানে নতুন বছরকে বরণ করে নেবে ঐতিহ্যবাহী এ সংগঠন। ভোর সোয়া ৬টায় শুরু হবে তাদের ৫১তম এ আয়োজন। প্রায় দুই ঘণ্টার এ অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন দেড় শতাধিক শিল্পী। অনুষ্ঠানটি শেষ হবে সকাল সাড়ে ৮টায়। ১৬টি একক গান, ১২টি সম্মেলক গান, ২টি আবৃত্তি দিয়ে সাজানো হয়েছে অনুষ্ঠান। বৈরি পরিবেশে ১৯৬৭ সাল থেকে বটমূলে বর্ষবরণের আয়োজন করে আসা ছায়ানটের এবারের অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য­– ‘বিশ্বায়নের বাস্তবতায় শিকড়ের সন্ধান’।

ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার। রমনাকে ঘিরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। অনুষ্ঠানস্থল ও এর আশপাশের এলাকার মানুষের নিরাপত্তায় ১১ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব, ডিবি ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নিয়োজিত থাকবেন। প্রস্তুত থাকবে বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট, ফায়ার সার্ভিসও।

একই স্থানে ছায়ানটের অনুষ্ঠানস্থলের কাছেই নববর্ষ উদযাপনের আয়োজন করেছে ডিএমপি। তাতে থাকছে কনসার্টও। ছায়ানটের আয়োজনের পরই শুরু হবে ডিএমপির অনুষ্ঠান।

বরাবরের মতোই বর্ষবরণের অন্যতম আকর্ষণ চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা। চারুকলা রবর্ষবরণ প্রস্তুতি কমিটি সূত্রে জানা গেছে, এবারের পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য ধরা হয়েছে লালন সাঁইয়ের গানের চরণ–‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। এবারের শোভাযাত্রায় থাকছে ৭টি মোটিফ। রাতের মধ্যে মঙ্গল শোভাযাত্রার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে বলে আশা করছে বর্ষবরণ প্রস্তুতি কমিটির। এবারও পহেলা বৈশাখে সকাল ৯টায় চারুকলা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্র বের হবে। সেটি শাহবাগ হয়ে শেরাটন হোটেলের মোড় ঘুরে ঢাবির টিএসসি হয়ে চারুকলা অনুষদের সামনে এসে শেষ হবে।

চারুকলার বর্ষবরণ প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক জাহিদ হক বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাত্র-ছাত্রী ও কর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য। কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হওয়ায় মঙ্গল শোভাযাত্রা পালনে কিছুটা শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন আর কোনও শঙ্কা নেই। শোভাযাত্রার কিছু কাজ বাকি আছে এখনও। সারারাত কাজ হবে। আশা করি শনিবার সকালের আগেই সব কাজ শেষ হয়ে যাবে।’

শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টায় গিয়ে দেখা যায়, চারুকলার গেটের বাম পাশে একটি ব্যানার টাঙানো। সেখানে লেখা আছে- ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’। বর্ষবরণ মঙ্গল শোভাযাত্রা-১৪২৫। সুলভে শিল্পকর্ম সংগ্রহ করুন, মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনে অংশীদার হোন।’ মঙ্গল শোভাযাত্রার খরচের বড় অংশ আসে চারুকলার বিভাগের বর্তমান ও সাবেক ছাত্র-ছাত্রীদের আঁকা বিভিন্ন চিত্রপট, নকশা করা মাটির পট বিক্রি করে। এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও আর্থিক সহযোগিতা করা হয়।

চারুকলা অনুষদ ঘুরে দেখা গেছে, পুরোদমে ব্যস্ত এ অনুষদের শিক্ষার্থীরা। তাদের দম ফেলার ফুসরত নেই। কেউ রং-তুলি দিয়ে সাজিয়ে তুলছেন  ক্যানভাস। কেউ মোটিফ তৈরির কাজ করছেন। কেউবা ঘুরে ঘুরে এসব কাজকর্মের দেখভাল করছেন।

এবার ৭টি মোটিফ/প্রতীক নিয়ে শুরু হবে নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা। প্রতীকগুলো হলো—সূর্য, বক-মাছ, হাতি, ছানাসহ মা পাখি, সাইকেলে মা-শিশু, টেপা পুতুল ও মহিষ। এগুলো তৈরি হচ্ছে বাঁশ, কাঠ ও বিভিন্ন রঙের কাগজ দিয়ে। তবে টেপা পুতুল, মহিষসহ কয়েকটি প্রতীকের কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি।

জাহিদ হক বলেন, এবার শোভাযাত্রায় নতুন একটি মোটিফ থাকছে, তাহলো মহিষ। মহিষ আসলে শান্ত ও নিরীহ একটি প্রাণী। মানুষের ধীরস্থিরের প্রতি নজর দিতে এটা করা হয়েছে। মূলত মানুষকে বুঝতে পরলেই সোনার মানুষ হওয়া যাবে, এটাই এবারের মূল উপজীব্য।

সেগুনবাগিচা থেকে চারুকলা ঘুরতে এসেছেন নাজিয়া জামান। তার সঙ্গে এসেছে ৭ বছরের ছেলে ও তিন বছরের মেয়ে। তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখের দিন রাস্তার যানজটের কারণে বাইরে বের হওয়া হয় না। তাই আগের দিন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে এখানে ঘুরতে আসি। এখানে আসলে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। তাই চেষ্টা করি প্রতিবছর পহেলা বৈশাখের আগের দিন এখানে আসতে।

চারুকলা অনুষদের বিভাগের ভেতরে মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতির নিরাপত্তা দিতে পুলিশের ১৪ সদস্যের একটি টিম কাজ করছে। এ টিমের সমন্বয়ক সাকিব বলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতির নিরাপত্তা নিশ্চত করতে তারা কাজ করছেন।

নববর্ষ উপলক্ষে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার সংগীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুরের ধারা। ১১ এপ্রিল শুরু হওয়া এ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তার ২৫ বছর পূর্তিও উদযাপন করছে। ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের সকালের প্রথম প্রহরে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার নেতৃত্বে সারাদেশ থেকে নির্বাচিত হাজারও শিল্পীর কণ্ঠে পরিবেশিত হবে নতুন বছরকে গ্রহণ করে নিতে বর্ষবরণের গান। এটি সরাসরি সম্প্রচার করবে চ্যানেল আই। অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে থাকছে বৈশাখী মেলাও।

বিকাল ৪টায় ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে শুরু হবে সম্মিলিত সাংস্কৃতি জোটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলা এ অনুষ্ঠানে থাকবে দলীয় ও একক  গান, আবৃত্তি, নৃত্য।

মীনা ট্রাস্ট ও মীনা বাজারের আয়োজনে সকাল পৌনে ৮টায় ধানমন্ডির ২/এ সড়কে সীমান্ত স্কয়ারের উল্টোপাশে রয়েছে সংগীতানুষ্ঠান। এতে গানে গানে নতুন বছরকে বরণ করবেন আমিনা আহমেদ, ভারতের মালা দেব বর্মণ, সাঈদা হোসেন পাপড়ি, ছন্দা চক্রবর্তী, মিতু সুপর্ণা, ফেরদৌসী কাকলি, রিফাত জামাল মিতু, তানভীরা আশরাফ শ্যামা, রুবা মজুমদার, প্রমোদ দত্ত, পীযূষ বড়ুয়া, মামুন জাহিদ খান, গোলাম হায়দার, জাকির হোসেন তপন, ড. মিন্টু কৃষ্ণ পাল, অনিরুদ্ধ সেনগুপ্ত। ওয়ার্দা রিহাবের পরিচালনায় নৃত্য পরিবেশন করবে ধৃতি নর্তনালয়, আবৃত্তি করবেন হাসিনা আহমেদ সোমা।