বুধবার , সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৮
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

মফস্বল সাংবাদিকতায় দিন বদলেছে

আরিফুল ইসলাম আরমান

আমার মফস্বল সাংবাদিকতা শুরু ২০০৫ সালে। স্থানীয় পত্রিকা সাপ্তাহিক সচেতনকণ্ঠে নিজস্ব প্রতিবেদক হিসেবে লেখতাম। কলেজ ছাত্র হওয়ায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা-সম্ভাবনা, শিল্পকলা-শিশু একাডেমীর নানা অনুষ্ঠান কাভার করাই ছিল প্রধান কাজ। এসব সংবাদই ছিল স্থানীয় সংবাদপত্রের প্রাণ। সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি এই মাধ্যমেই। সম্পাদক ও তার বন্ধুদের দেখতাম জেলার কত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো কাভার করছেন। কে কার চেয়ে আগে সংবাদ লিখে ঢাকায় পাঠাবেন তার প্রতিযোগিতা চলতো। মাধ্যম ছিল টিঅ্যান্ডটির ইন্টারনেট আর ফ্যাক্স। ভাবতাম তাদের মত আমিও কবে ঢাকার পত্রিকায় সংবাদ পাঠাবো। এই প্রতিযোগিতায় নামতে পারবো।


মফস্বল সাংবাদিকতায় পরিবর্তন এসেছে। ঢাকায় ডেস্ক সংবাদিকতার মত মফস্বলেও এখন কী-বোর্ডে ঝড় ওঠে, যে কোনো সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। ছবি বা ভিডিও চিত্রের চাহিদা থাকার কারণে ছুটতে হচ্ছে ঘটনাস্থলে। একাধিক ঘটনাস্থল হলে একেকজন ছুটেন একেক দিকে। ফেসবুকের মত এখানেও রয়েছে ‘শেয়ারিং’ ব্যবস্থা। যে যার মত করে ছবি বা ভিডিও চিত্রের সম্পাদনা শেষে পাঠিয়ে দেন ন্যাশনাল ডেস্কে। অপেক্ষায় থাকেন কখন সংবাদটি টিভি স্ক্রল বা সংবাদে যুক্ত হবে। প্রিন্ট মাধ্যমের অনলাইন ভার্সনের প্রতি মুহূর্তের আপডেটের কারণে এযাত্রায় সঙ্গী পত্রিকার সাংবাদিকরাও।


টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর এখন বড় একটি সংবাদ উৎস হচ্ছে অনলাইন নিউজ পোর্টাল। একসময় আন্তর্জাতিক সংবাদের প্রয়োজনে তারা যেমন বিবিসি, সিএনএনকে গুরুত্ব দিতেন, দেশের অনলাইন পোর্টালগুলো এখন তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এক পোর্টালেই সারাদেশ। ৪-৫টি পোর্টাল দেখলে পাওয়া যাচ্ছে ৪-৫শ সাংবাদিকের সংবাদ। যার সংখ্যা তার টেলিভিশন চ্যানেলের চেয়ে কম নয়। অনেকে টেলিভিশন চ্যানেল তো অনলাইন নিউজ পোর্টাল দেখেই স্ক্রল দিয়ে দিচ্ছে। পরে তা নিজস্ব প্রতিনিধির মাধ্যমে ক্রসচেক করে নিচ্ছে।


মফস্বল সাংবাদিকদের সঙ্গে মাঝে মাঝেই কথা হয়। অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোর জন্য টিভি সাংবাদিকরা নাকি দৌড়ের ওপর থাকেন। পোর্টালে মফস্বলের কোনো ব্রেকিং নিউজ দেখলেই টেলিভিশন চ্যানেলের নিউজরুম থেকে ফোন যাওয়া শুরু করে প্রতিনিধিদের কাছে। ‘কেন দেরি হচ্ছে? জাগো নিউজ দিয়ে দিয়েছে আপনি এখনো পাঠাননি কেন?’ প্রতিযোগিতা বাড়ছেই। ছবি বা ভিডিও চিত্রের আগে তথ্যটাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। যে যত আগে তথ্য সংগ্রহ করে ন্যাশনাল ডেস্কে জানাতে পারবেন সেই এগিয়ে। অনেক টেলিভিশন চ্যানেলই এখন তাদের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে এসএমএসে সংবাদ সংগ্রহ করছে। আগে স্ক্রল, পরে বিস্তারিত। সবাই ব্রেকিং জানতে চায়, ছোট করে। বিস্তারিত জানবে সময় হলে।


এতো সংবাদ! এতো প্রতিযোগিতা! কেমন আছেন মফস্বলের সাংবাদিকরা? এখনো কী তারা যে সম্মানী পায় তাতে তাদের সংসার চলে? অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। তবে আশাব্যঞ্জক নয়। অনেক টেলিভিশন চ্যানেলেই নিয়োগ পেতে দিতে হচ্ছে মোটা অংকের ‘ডিপোজিট মানি’। পত্রিকায় নিয়োগের জন্য মফস্বল সম্পাদকের বাসায় যাচ্ছে ‘পুকুরের ইলিশ’। ব্যতিক্রম অনলাইন সাংবাদিকতায়। যোগ্যতাই যেখানে প্রধান। ছোট উদ্যোগ তবে স্বপ্নটা বড়। প্রতিযোগিতার ভীড়ে অশুভ সাংবাদিকতার চর্চা থাকলেও টিকে থাকছে মূলধারার অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোই।


ফেসবুকের নিউজ ফিডে প্রতিদিন যেমন শতাধিক নিউজ পোর্টালের পোস্ট দেখা যায় তেমনি মফস্বলেও রয়েছে সেই সব পোর্টালের শত শত প্রতিনিধি। সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে যারা হাঁটছেন উল্টো পথে। মফস্বল সাংবাদিকতায় এধারা নতুন নয়। চলছে অনেকদিন ধরেই। তবে বিভ্রাটে পড়ছেন প্রকৃত সাংবাদিকরা। ভুঁইফোড় নিউজ পোর্টালের প্রতিনিধিদের ভিড়ে মূলধারার অনলাইন নিউজ পোর্টালের সাংবাদিকদের মাঝে মধ্যেই পড়ছেন বিপাকে। সবকিছু ছাপিয়ে তারা কাজ করছেন অবিরাম।


নব্বইয়ের দশকের মফস্বল সাংবাদিকরা নাকি ডাকযোগে ঢাকায় সংবাদ পাঠাতেন। শনিবারের সংবাদ প্রকাশিত হতো মঙ্গলবার বা বুধবার। জরুরি সংবাদ হলে স্থানীয় কোনো সরকারি অফিসের বড় কর্মকর্তার টিঅ্যান্ডটি ফোন থেকে ঢাকায় সংবাদ দিতেন। শুরু হলো ফ্যাক্সের যুগ। ইন্টারনেট এলো। এবার দ্রুত গতির ইন্টারনেট। মোবাইলেই সবকিছু। মফস্বল সাংবাদিকরা এখন ‘স্মার্ট জার্নালিস্ট’। জেলার যে কোনো জায়গা থেকে যে কোনো সময়ে কোনো তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিচ্ছেন ন্যাশনাল ডেস্কে। টেলিভিশনে চলছে স্ক্রল, অনলাইনে ‘বিস্তারিত আসছে…’। বিস্তারিত জেনে ক্রসচেক করে পুরো সংবাদ পাঠিয়ে দিচ্ছেন এক ঘণ্টার মধ্যেই। পরের দিনের পত্রিকার জন্য অপেক্ষা নয়। এক মুহূর্তেই নিজের লেখা সংবাদ ছবিসহ প্রকাশ হচ্ছে অনলাইনের পৃষ্ঠায়। ছড়িয়ে যাচ্ছে বিশ্বজুড়ে। আলোচনায় কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে ফেসবুক, টুইটারে। এভাবেই বদলে যাচ্ছে আমাদের মফস্বল সাংবাদিকতা।