সোমবার , সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

SLIP যেন SLIP না হয়


মোহাম্মদ আমিরুল মোসলেমীন
ইংরেজিতে SLIP শব্দের অর্থ হাত ফসকে পড়ে যাওয়া বা সঠিক জায়গা থেকে সরে যাওয়া। আমাদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের SLIP হচ্ছে (School Level Improvment Plan- SLIP) বিদ্যালয় পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা। বিদ্যালয় পর্যায়ে গৃহীত এ পরিকল্পনায় স্থানীয় জনগণের শিক্ষা সম্পর্কিত আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটে। স্লিপ শুধু একটি প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক পরিকল্পনা নয়, এটি প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের পথিকৃত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি বিদ্যালয় পর্যায়ের উন্নয়নের একটি ঝর্ণা ধারার মতো। সুদূর অতীত হতে এদেশে প্রাথমিক শিক্ষা সাধারণ জনগণের উদ্যোগ ও সাহায্য-সহযোগিতায় পরিচালিত হতো। শিক্ষার উৎকর্ষ সাধনে ব্যক্তি, সাধারণ জনগণ ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক সম্পৃক্ততা ছিল। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণের মাধ্যমে নানা সুফল নিশ্চিত হলেও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি প্রদান পূর্বক রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব সম্প্রসারণ হলেও এক্ষেত্রে ব্যক্তি, জনগণ ও প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ প্রত্যাশিতভাবে সম্প্রসারিত হয়নি। স্মর্তব্য যে, কোনো বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এলাকায় জনগণের যতক্ষণ পর্যন্ত ঐ বিদ্যালয়ের প্রতি মালিকানাবোধ বা আন্তরিকতা সৃষ্টি না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত ভৌত ও পরিবেশগত উন্নয়ন কিংবা মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এদেশের সরকার প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মান উন্নয়নের লক্ষ্যে পর্যায়ক্রমে SLIP কার্যক্রম চালু করেছে।
স্লিপের লক্ষ্য হচ্ছে স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণে সরকারি স্লিপ গ্র্যান্টের পাশাপাশি স্থানীয় বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ হতে সম্পদ সংগ্রহের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল গঠন পূর্বক বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশের উন্নয়ন সাধন করে প্রাক-প্রাথমিক হতে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত সকল বিদ্যালয়গামী শিশুকে একীভূত, সমতাভিত্তিক (Equity) ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা।
স্লিপের উদ্দেশ্য হচ্ছে ঃ
১. মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন।
২. সমতা/ন্যায্যতা (Equity) নিশ্চিত করা।
৩. স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্তকরণ অর্থাৎ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণকে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্তকরণ। [উৎস SLIP Guideline] বিষয়টিকে প্রাধান্য দিলে বলা যায় বিদ্যালয়ের সাথে স্থানীয় জনগণের নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন ও বিদ্যালয়ের প্রতি মালিকানাবোধ সৃষ্টিকরণ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে স্থানীয় জনগণের সাথে বিদ্যালয়ের নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হবে? এক্ষেত্রে সম্পর্ক তৈরির ভূমিকাটা কার সবচেয়ে বেশি ? আসলে স্লিপ কার্যক্রমে একটি স্লিপ প্রণয়ন টিম রয়েছে। এক্ষেত্রে টিম লিডারকে সুচারুভাবে তার দায়িত্ব পালন করে তাকে যোগ্যতার ডানা মেলে ধরতে হয়। টিম লিডার বা সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে এসএমসি, পিটিএ, অভিভাবকবৃন্দ, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, স্টুডেন্টস কাউন্সিল, শিক্ষক, সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্যসহ অন্যান্য স্টেক হোল্ডারদের সাথে পর্যায়ক্রমে মতবিনিময় সভা করতে হবে। তাদেরকে একটি আদর্শ স্কুল/প্রত্যাশিত স্কুল/ এসো গড়ি স্বপ্নের স্কুলের স্বপ্ন দেখাতে হবে। যে স্বপ্ন তাদেরকে ঘুমাতে দেবে না। তারা তাদের স্বপ্নের স্কুলকে এলাকার বাতিঘর হিসেবে চিহ্নিত করবে এবং এলাকার সকল উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ভাবতে শিখবে। বিদ্যালয়ের উন্নয়নই হবে তাদের ধ্যান-খেয়াল। এক আকর্ষণীয় বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করার প্রতিযোগিতায় নামবে তারা। আর এই ভানুমতির খেলের ক্রীড়ানক হবে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক। স্থানীয় জনগণ যেন ভাবতে শিখে ‘সন্তান আমাদের, বিদ্যালয় আমাদের, দায়িত্ব আমাদেরই’। আর এই প্রত্যয় দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করে স্থানীয় জনগণকে উজ্জীবিত করতে পারাই স্লিপের সফলতা। আর যদি বিদ্যালয় এলাকার জনগণকে একটি আদর্শ বা প্রত্যাশিত বিদ্যালয়ের স্বপ্ন দেখাতে না পারি কিংবা তাদেরকে সেই স্বপ্নে বিভোর করানো না যায় এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাদের উজ্জীবিত না করা যায় তাহলেই আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্লিপ সঠিক জায়গা থেকে ছিটকে পড়বে বা SLIP কাটবে।
সরকার প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে SLIP বাস্তবায়নের জন্য যে অর্থের যোগান দেয় তাই হচ্ছে স্লিপ গ্র্যান্ট। এই স্লিপ গ্র্যান্টকে সিডমানি বা উদ্যোগ শুরুর অর্থ হিসেবে গণ্য করে স্থানীয় সম্পদের সমন্বয়ে বিদ্যালয়কে কাঙ্খিত মানে উন্নীত করাই এর মূল লক্ষ্য। কিন্তু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যায়লগুলো এক্ষেত্রে কতটুকু সফল ? এটিই বিবেচ্য বিষয়। বর্তমানে প্রতিটি বিদ্যালয়ে স্লিপ গ্র্যান্টের অর্থের পরিমাণ ন্যূনতম ৫০,০০০/- টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১,০০,০০০/- টাকা প্রদান করা হচ্ছে। পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, স্লিপ গ্র্যান্ট অর্থাৎ সরকার যে অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে শুধুমাত্র তা দিয়েই অধিকাংশ বিদ্যালয়ে উন্নয়ন কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু স্লিপের লক্ষ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকার প্রদত্ত স্লিপ গ্র্যান্ট ও স্থানীয় বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ হতে সংগৃহীত সম্পদ সংগ্রহ করে বিদ্যালয়ে নিজস্ব তহবিল গঠন করে বিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী উন্নয়নমূলক কাজ করা। তাই মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নে তথা টেকসই উন্নয়নে আমাদেরকে আরও সজাগ ও সচেষ্ট হতে হবে।
পরিশেষে ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই, “ Head teacher is the poster of a school”. তাই প্রতিটি বিদ্যালয়ে দক্ষ ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। অভিজ্ঞতা যেমন মানুষকে সাবধানে পথ চলতে শেখায় তেমনি লব্ধ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অনেক দুরূহ কাজও সহজে করা যায়। এই ধারণা থেকে বলা যায় যে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য সরাসরি প্রধান শিক্ষক নিয়োগ না দিয়ে যদি সহকারি শিক্ষক থেকে সহকারি প্রধান শিক্ষক, সহকারি প্রধান শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয় তাহলে তারা চাকুরি জীবনে শুরু থেকে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য কী কী কাজ করা প্রয়োজন সেই লব্ধ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যালয়ের উন্নয়ন করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।
তাই আমার ধারণা আগে সহকারি শিক্ষক পরে সহকারি প্রধান শিক্ষক তারপর প্রধান শিক্ষক এভাবে ক্রমান্বয়ে পদোন্নতি দিয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ পূরণ করতে হবে যার তত্ত্বাবধানে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন সহজতর হবে।

লেখক: মোহাম্মদ আমিরুল মোসলেমীন, প্রধান শিক্ষক, শ্রীরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জামালপুর সদর, জামালপুর।

error: Content is protected !!