সোমবার , জুন ২৫, ২০১৮

 ভাষা সৈনিক বদিউর রহমান তালুকদার  ভাষার জন্য সংগ্রাম করতে  বহিস্কার হয়েছিলেন  বিদ্যালয় থেকে

আজিজুর রহমান চৌধুরী
ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক হওয়ায় ১৯৫২ সালে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে ঝড়ে পড়েছিলেন দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা শহরের বাসিন্দা ভাষা সংগ্রামী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. বদিউর রহমান তালুকদার। মাতৃভাষা বাংলা চাই আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক হওয়ার অপরাধে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে তাকে দেওয়ানগঞ্জ সমবায় উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করে তার ছাত্রত্ব কেড়ে নেয়া হয়েছিল। এতে তিনি দীর্ঘদিন কোন বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেননি। তবে ভাষা আন্দোলনের দশ বছর পর মেট্রিক পাশ করলেও বয়স বেড়ে যাওয়ায় তিনি আর উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেননি। এই ভাষা সংগ্রামী মো. বদিউর রহমান তালুকদার ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়কালে ১১নং সেক্টরের মহেন্দ্রগঞ্জ সাব সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা বাছাই কমিটির সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধেও পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তিনি ১৯৩৪ সালের ২৬ মার্চ দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা শহরের কালিকাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছেন। তার পিতার নাম মৃত ছমির উদ্দিন তালুকদার এবং মাতার নাম মৃত ছলিমন নেছা।
ভাষা সংগ্রামী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. বদিউর রহমান তালুকদার জানান, ১৯৫২ সালে আমি দেওয়ানগঞ্জ সমবায় উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় ভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়েছি। এরপর ভাষা আন্দোলনের দেওয়ানগঞ্জ থানা কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছি। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে ১৯৫২ সালে দেওয়ানগঞ্জ সমবায় উচ্চ বিদ্যালয় ছাত্র সংসদের তৎকালীন জিএস মো: ফরহাদ খলিলের নেতৃত্বে দেওযানগঞ্জ বাজার এলাকায় মাঝে মধ্যেই মিছিল ও সমাবেশ করেছি। ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় সংগঠক হওয়ায় রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে দেওয়ানগঞ্জ থানার তৎকালীন সার্কেল অফিসার এবং দেওয়ানগঞ্জ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার উপস্থিতিতে ১৯৫২ সালের ১৫ই মার্চ সমবায় উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ আমাকে বিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করে আমার ছাত্রত্ব কেড়ে নিয়েছিলেন।একইদিন রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে দেওয়ানগঞ্জ সমবায় উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ আমার সহকর্মী ভাষা সংগ্রামী সাখাওয়াত হোসেন, জাকিউল হক, সৈয়দুজ্জমান ও আব্দুল গণিকেও বিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করে তাদের ছাত্রত্ব কেড়ে নিয়েছিলেন। আমদের ৫জনকে ভাষা সংগ্রামী ও রাষ্ট্রদ্রোহী হিসাবে বিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করার পর আমাদেরকে গ্রেফতারের জন্য পুলিশ হুলিয়া জারি করেছিল। তখন থেকে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়িয়েছি বহুদিন। এরপরও এলাকার ছাত্র ও সাধারণ মানুষের মাঝে ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য তোলে ধরেছি। আমরা কয়জন বন্ধু মিলে দেওয়ানগঞ্জ থেকে বাইসাইকেলে চড়ে বকশীগঞ্জের নিলক্ষিয়া উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিদ্যালয় এবং হাট-বাজারে গিয়ে ছাত্র ও সাধারণ জনতাকে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় হতে উৎসাহ যুগিয়েছি। আমার ভাষা আন্দোলনের এসব ইতিহাস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহ শালা এবং জামালপুর পাবলিক লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত বহিতে লিপিবদ্ধ রযেছে। এছাড়াও আমি একজন ভাষা সৈনিক হিসাবে জামালপুর জেলা প্রশাসকসহ স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছে একাধিকবার সম্মাননা স্মারক ও ক্রেষ্ট পেয়েছি।
ভাষা সংগ্রামী বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. বদিউর রহমান তালুকদার আরও বলেন, আমি ৫২’র ভাষা আন্দোলনের পর ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে আমার বড় ভাই ডা: রফিক উদ্দিনকে (ইসলামপুর,দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ) আসন থেকে এমএনএ নির্বাচিত করতে সক্রিয় ভুমিকা রেখেছি। এরপর ডা: রফিক উদ্দিন তৎকালীন শিল্প মন্ত্রনালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে তার সহযোগীতায় দেওয়ানগঞ্জে জামালপুরের সর্ববৃহৎ ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠান জিলবাংলা চিনিকল প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি। এছাড়াও আমি ১৯৬৮ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত দেওয়ানগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন কালে ১৯৬৯ সালের গণ অভূত্থানে এবং ১৯৭০ সালের এমএনএ নির্বাচনের সময় সততার সাথে নির্বাচনী গুরুত্বপুর্ণ দায়িত্ব পালন করেছি। এরপর ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ দেওয়ানগঞ্জ থানা মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেছি। ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়কালে ১১নং সেক্টরের মহেন্দ্রগঞ্জ সাব সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা বাছাই কমিটির সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পূনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছি। এছাড়াও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর স্বপ্নের সোনারবাংলা বিনির্মাণে ২০১২ সন পর্যন্ত দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সভাপতি ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। বর্তমানেও আমি দেওযানগঞ্জের কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও দেওয়ানগঞ্জ বাজার কেন্দ্রিয় জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালনসহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত রয়েছি।
সর্বোপরি ভাষা সংগ্রামী ও বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. বদিউর রহমান তালুকদার বলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পরবর্তী প্রজন্মকে একটি কথাই বলতে চাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর নেতৃত্বে বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জন করেছি আমাদের স্বাধীনতা। এছাড়াও ভাষা সৈনিক সালাম, রফিক, জব্বার ও বরতসহ ৭টি তাজা প্রানের বিনিময়ে পেয়েছি আমার মায়ের ভাষা বাংলা। এ দুটোই কেড়ে নিতে চেয়েছিল পাকিস্তানি প্রেতাতœা ও হিংস্র পাক হানাদার বাহিনী। ওই পাক প্রেতাতœা ও তাদের দোসররা আজও বাংলার জমিন থেকে নি:শেষ হয়ে যায়নি। তাই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনারবাংলা বিনির্মাণে পাক প্রেতাতœাদের কালো থাবা থেকে সর্বদাই এ দেশের স্বাধীনতা সার্বোভৌমত্ব ও আমার মায়ের ভাষাকে আগলে রেখো তোমরা।