বুধবার , জুলাই ১৭, ২০১৯
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

নতুন করে লিবিয়া সংকটের আশঙ্কা


খালেদুল ইসলাম
লিবিয়ায় গাদ্দাফির পতনের পর আন্তর্জাতিক নষ্ট রাজনীতির প্রেক্ষাপট তৈরি হয়ে গিয়েছে লিবিয়ার মাটিতে। একদিকে আমেরিকা, তুরস্ক ও জাতিসংঘ সমর্থিত ফায়েজ আল সিরাজ এর জাতিসংঘ সরকার, যারা কিনা লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি শাসন করে। যা কিনা লিবিয়ার মোট আয়তনের ১৫ ভাগ। অপরদিকে লিবিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ গাদ্দাফির সেনাপ্রধান খলিফা হাফতার শাসন করে লিবিয়ার প্রায় ৮৫ ভাগ জায়গা। এপ্রিলের প্রথম দিকে খলিফা হাফতার সমগ্র লিবিয়া দখলের ঘোষণা দেয়। এতেই শুরু হয় সংঘাত। খলিফা হাফতারকে সরাসরি সমর্থন দেয় সৌদি আরব, আরব আমিরাত, মিশর ও জর্ডান এবং নৈতিক ভাবে সমর্থন দেয় রাশিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন। লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি দখল করার জন্য খলিফা হাফতারের অভিযানের মুখে মোটেও সুবিধা করতে পারছে না জাতিসংঘ সমর্থিত সরকার। শেষ পর্যন্ত তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান ঘোষণা দিয়েছে যে কোন মূল্যে লিবিয়া কে হাফতার বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা করা হবে। এর পরেই বদলে যাচ্ছে প্রেক্ষাপট, মধ্যপ্রাচ্যে তথাকথিত খিলাফত দাবিদার আইএস (যা কিনা মূলত ইসরায়েলী স্টেট) ঘোষণা দিয়েছে লিবিয়া দখল করার। ঠিক তখনই আইএস লিবিয়া দখল করার ঘোষণা দিল যখন খলিফা হাফতার লিবিয়ার জনগণকে সাথে নিয়ে লিবিয়াকে জাতিসংঘ নামক নব্য সা¤্রাজ্য থেকে দখল করার জন্য অগ্রসর হচ্ছেন। এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় আইএস মূলত আমেরিকা ও তুরস্ক সমর্থিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। বুদ্ধিমানদের জন্য বুঝার ক্ষেত্রে আরও সহজ করে দেওয়া যায়, যে আইএস এর জন্য হিলারি ক্লিনটন তহবিল সংগ্রহ করেছে তা এখন স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। আরব রাষ্ট্রগুলোকে রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল রাখা, সেখানে অস্ত্র ব্যবসা ও আরব রাষ্ট্রসমূহ হতে সহজলভ্যে তেল পাওয়ার লোভে আমেরিকা এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে মদদ দেয়, যার সাথে আবার যোগ হলো তুরস্কের নাম। যদিও অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক অনেক আগে থেকেই দাবি করছে আইএস এর পিছনে তুরস্কের ইন্ধন আছে। কারণ আইএসের তেলের প্রায় পুরোটুকু যায় তুরস্ক সীমানা হয়ে। আরবরা ও মধ্যপ্রাচ্যের মানুষরা জাতিগতভাবেই বাইরের কারো মাতব্বরি পছন্দ করে না, যা ইতিহাসে আমরা বারবার দেখতে পাই। সুতরাং ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়াসহ যে সমস্ত আরব রাষ্ট্র গুলোতে বাইরের দাদারা এসে মাতব্বরি করে সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে আরবের জনগণকে সাথে নিয়ে করতে হবে। সর্বশেষ শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী হামলায় গোয়েন্দা তথ্যমতে আইএসকে অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করে ভারতের সাতটি প্রতিষ্ঠান। আর এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্ত্র তুরস্ক হয়ে আইএস এর হাতে পৌঁছায়। অতঃপর লিবিয়ার বর্তমান প্রেক্ষাপট নিয়ে আমেরিকা ও তুরস্ক যদি রক্ত রক্ত খেলা খেলতে চায় তাহলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। কারণ জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থানরত খলিফা হাফতারকে পূর্ণভাবে সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরব, মিশর, আরব আমিরাত, জর্ডান ও রাশিয়া সহ বড় বড় রাষ্ট্র। যাদের ভিতরে কেউ কেউ আমেরিকার মিত্র, কেউ কেউ তুরস্কের মিত্র। একই সাথে এই প্রেক্ষাপট থেকে তুরস্কের সাথে আরবের সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে। সুতরাং শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে আরবের জনগণকে সাথে নিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধুমাত্র ত্রিপোলিতে হাজার পাঁচেক মানুষ নিয়ে খলিফা হাফতার বিরোধী মিছিল করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এটা বুঝানো সম্ভব নয় যে, লিবিয়ার মানুষ হাফতার বিরোধী। এটা সুস্পষ্টভাবে পরিষ্কার যে লিবিয়ার প্রায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হাফতারের পক্ষে। সুতরাং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অবশ্যই আমেরিকা, তুরস্ক ও জাতিসংঘকে আরো বুদ্ধিমান হতে হবে। লিবিয়ার জনগণের যে প্রাণের দাবি তার সাথে ঐক্যমতে এসে খলিফা হফতারের হাতে হাত রেখেই লিবিয়াতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ দেরি হলেও সৌদি আরব, আরব আমিরাত, মিশর, জর্দান এরা বুঝতে পেরেছে যে আরবের ভিতর পশ্চিমাদের দাদাগিরি তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ। এখন আরবের ভিতর পশ্চিমা হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে তারা যে কোনো মূল্যে অবস্থান নেবে এবং যেকোন মূল্যে লিবিয়ার বাকি ১৫ শতাংশ জায়াগা যা কিনা জাতিসংঘ আমেরিকা ও তুরস্ক সমর্থিত সরকার শাসন করে তা আরবরা পুনরুদ্ধার করতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। ফলে সংঘাত আরো দীর্ঘমেয়াদী হবে। অপরদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান ঘোষণা দিয়েছেন যে কোনো মূল্যে লিবিয়াকে ফায়েজ আল সিরাজের সরকারের হাতেই তারা রাখবে। এই ঘোষণার পরপরই খলিফা হাফতারের বাহিনী দুই তুর্কি কমান্ডোকে গ্রেফতার করে লিবিয়া থেকে এবং তাদের হত্যা করে। এখান থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায় জাতিসংঘ সমর্থিত সরকারের সেনাবাহিনীকে লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে তুরস্ক লিবিয়াতে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছে যা কিনা একটি চরম ভুল এবং তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান এর একটি অদ্ভুত সিদ্ধান্ত। অপরদিকে তুরস্ক এক ফিলিস্তিনি নাগরিককে আরব আমিরাতের গুপ্তচর অপবাদ দিয়ে গ্রেফতার করে এবং জেলখানায় সে ব্যক্তি রহস্যময় ভাবে নিহত হয়। সুতরাং উচিত এই দুই পক্ষকে আলোচনার টেবিলে এনে জনগণের দাবি লিবিয়াতে একটি এমন সরকার গঠন করে দেওয়া যেখানে আন্তর্জাতিক কোনো প্রভাব থাকবে না। তা না হলে এই যুদ্ধাবস্থার ভিতর চলতে চলতে ক্ষতিগ্রস্থ হবে বেসামরিক মানুষ, নারী, শিশু সহ নষ্ট হবে অনেক সম্পদ। এবং ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাবে আরো একটি রাষ্ট্র।

error: Content is protected !!