বৃহস্পতিবার , এপ্রিল ২৫, ২০১৯
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

সাংবাদিক নেতা শফিক জামান লেবু ও তার স্বপ্ন


মদন মোহন ঘোষ, দেওয়ানগঞ্জ
মনের অবস্থাটা মোটেই ভাল না। ২৩ মার্চ আমার সহদোর ছোট ভাই জিল বাংলা চিনি কলের শ্রমিক শ্যাম সুন্দর ঘোষ ঘুমের মধ্যে ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন। শুক্রবার রাতে ঘুমানোর জন্য বিছানায় উঠেছি মাত্র মোবাইল ফোনটি বেজে উঠল। ফোন ধরতেই কানে ভেসে আসল দাদা আমি জুয়েল, লেবু ভাই একটু আগে মারা গেছেন। ছোট ভাইকে হারিয়ে শোক কাটতে না কাটতেই বড় ভাই সমতুল্য লেবু ভাইয়ের মুত্যৃর সংবাদ। ৮৭-৮৮ সাল থেকে সংবাদপত্রে লেখালেখি শুরু। ৯১-৯২ দিকে লেবু ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয়। সে সময় ঢাকা থেকে প্রকাশিত হত একটি জাতীয় দৈনিক। পত্রিকাটির নাম ছিল “দৈনিক পত্রিকা”। লেবু ভাই জেলা প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করতেন। আমি দেওয়ানগঞ্জ প্রতিনিধি হিসাবে ছিলাম। এখন আমরা যত সহজে সংবাদ তৈরি করে দ্রুত অফিসে পাঠাই সে সময় এ ধরনের সুযোগ সুবিধা ছিল না। হাতে লিখে ডাক বিভাগে অথবা টেলিফোনে, পরবর্তীতে ফ্যাক্স, এখন আধুনিক ডিজিটাল সুবিধা ভোগ করছেন সংবাদকর্মীরা। সংবাদ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে লেবু ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য প্রায়ই জামালপুরে যাতায়াত ছিল। মধুপুর রোডে আবুল এন্ড কো’তে চাকুরী করতেন লেবু ভাই। এ দোকান থেকেই নিয়মিত সংবাদ সংগ্রহ করতেন। আমরা বেশ কয়েকজন সংবাদ কর্মী এ দোকানে বসেই গল্প গুজব করতাম। সময় কাটিয়ে চলে আসতাম দেওয়ানগঞ্জে। গল্পের অধিকাংশ সময়ই ছিল সংবাদ সংক্রান্ত। প্রায়ই লেবু ভাই তার সহজ সুলভ কন্ঠে বলতেন এটা এভাবে করেন ওটা ওভাবে করেন। ৯০ দশকে সংবাদপত্র সাংবাদিকতা ও গণচেতনা বিষয়ে আমি একটি সেমিনার করি। সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয় দেওয়ানগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এ অন্ষ্ঠুানে লেবু ভাই ছিলেন প্রধান আলোচক। প্রধান অতিথি ছিলেন সে সময়ের উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ দুলা। লেবু ভাই ছিলেন সার্বক্ষনিক সাংবাদিক। মফস্বল সাংবাদিকদের উন্নয়ন নিয়ে প্রচন্ড ভাবনা ছিল। ইদানিং সাংবাদিকতার নামে অপসাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ছিল কঠিন। সাংবাদিক নামধারী চাদাবাজদের রুখতে সোচ্চার ছিলেন। পাশাপাশি জেলা বা উপজেলার কোন সংবাদকর্মীর বিপদে আপদে পাশে দাঁড়াতে কখনও ভুল করতেন না। জামালপুর ফায়ার সার্ভিস সংলগ্ন সে সময় ছিল ছোট একটি প্রেসক্লাব। এ ক্লাবে সিনিয়র সাংবাদিকদের সঙ্গে হাসি ঠাট্টা আড্ডা হত। সিনিয়রদের মধ্যে অনেককেই আমরা হারিয়েছি। জামালপুর জেলা প্রেসক্লাব লেবু ভাইয়ের হাতে গড়া প্রিয় সংগঠন। তিনি ছিলেন সার্বক্ষনিক সাংবাদিক। ক্লাবটি ছিল তার কর্মস্থল। মাত্র কিছুদিন আগে ক্লাবের কার্যকরী কমিটির আলোচনা সভায় উপস্থিত সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, যারা প্রকৃত সাংবাদিক তাদের শ্রদ্ধা করতে। এক সময় যারা সাংবাদিকতা করতেন প্রেসক্লাবের সদস্য বয়সের কারণে হোক বা অসুস্থতার কারনে সংবাদপত্র থেকে বিদায় নিয়েছেন তাদের পাশে দাঁড়াতে এবং তাদের বাড়িতে গিয়ে খোজখবর করে কুশল বিনিময় করার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। যাতে তারা মনে করেন সাংবাদিক ভাইরা তাদের ভুলে নাই। একই সভায় জেলার অসুস্থ সাংবাদিকদের আর্থিক সহযোগিতা করার জন্য একটি সাংবাদিক কল্যাণ তহবিল গঠনের জন্য প্রস্তাব করেছিলেন। উপস্থিত সকল সদস্য নগদ অর্থ জমা করে তহবিল গঠন করেন। জামালপুর জেলা ও উপজেলা গুলোর প্রকৃত সাংবাদিকদের জেলা প্রেসক্লাবে অন্তর্ভূক্ত করার বিষয়টি ছিল লেবু ভাইয়ের বিশেষ উদ্যোগ। ক্লাব সদস্যদের সঙ্গে ছিল তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা। যেন সবাই একই পরিবারের সদস্য। দেখতেন সবাইকে সমান চোখে। দেখা মাত্রই বলে উঠতেন এই চা খেয়েছেন, ভিতরে বসেন, লেবু ভাই এনটিভি ও বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। জামালপুর জেলা প্রেসক্লাবের পরপর কয়েকবারের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। জামালপুর জেলা প্রেসক্লাবের সাংবাদিক নেতা হিসাবে তার একটি স্বপ্ন। জেলা প্রেসক্লাবের জমি ও ভবন নির্মাণ। এ বিষয় নিয়ে আজকের জামালপুর পত্রিকার সম্পাদক জলিল ভাইকে বলেছেন। জলিল আমরা সহযোগিতা করব। আপনি আমাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন। লেবু ভাই আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। কিন্তু আমরা যেন তার স্বপ্ন সবাই মিলে বাস্তবায়ন করতে পারি এবং শোককে শক্তিতে পরিণত করে একত্রে থাকতে পারি এবং সাংবাদিক নামধারী অপসাংবাদিকদের বিরুদ্ধে লেবু ভাইয়ের মত সোচ্চার হই।

error: Content is protected !!