শুক্রবার , আগস্ট ২৩, ২০১৯
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

খবরের ফেরিওয়ালা হয়ে উঠার গল্প

শওকত জামান

গল্পটা খুবই সাদামাটা। কিভাবে খবরের ফেরিওয়ালা হলাম।  ছেলেবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি ঝোঁক ছিল আমার। ১৯৮৯ সালের দিকে আমি জামালপুর জিলা স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি। তখন থেকেই কবিতা লিখতে শুরু করি। প্রথম প্রথম কবিতা লিখে নিজেই পড়তাম আর বিছানার নিচে আর্কাইভে জমিয়ে রাখতাম। মাঝে মাঝে স্কুল ব্যাগের পকেটে রাখা এক টুকরো কাগজে লেখা কবিতা টিফিন প্রিয়ডের সময় ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে এসডিও’র ঘাটে বসে শুনাতাম সহপাঠিদের। এক পর্যায়ে কবিতা লেখা নেশায় পরিনত হলো।

 

অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালিন বার্ষিক পরিক্ষার আগেরদিন পড়ার টেবিলে বসে ডায়রিতে কবিতা লিখছি। আমার সেজু ভাই যাকে আমি দাদা ভাই বলে ডাকি পেছন থেকে এসে দেখছে কবিতা লেখায় মগ্ন আমি । দেখেই অগ্নীমুর্তি হয়ে আমাকে মারধরের শেষে ৩টি কবিতার ডায়রি ইটের সাথে রশি দিয়ে বেঁধে জানালা দিয়ে পুকুরে ফেলে দিয়েছিল। মারখেয়ে কোন কষ্টই পায়নি, পেয়েছিলাম কবিতার ৩টি ডায়রির জন্য। আমার লেখা অনেক কবিতা ছিল পুকুরের জলে সমাধি হওয়া ডায়রি ৩টিতে। অনেক কেঁদেছি হারিয়ে যাওয়া কবিতার শোকে। তারপর রাগ ক্ষোভে অভিমানে অনেক দিন কবিতার সাথে দেখা হয়নি। বিরহ পর্ব চলেছে কয়েক বছর। কষ্ট ভুলে গিয়ে আবার ফিরে এলাম কবিতার ভালবাসার টানে। টুক টাক কবিতা লেখতে শুরু করলাম। সেসময় লিটলম্যাগ রাঙা পলাশসহ বার্ষিকী ও স্থানীয় পত্রিকায় আমার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে।

 

এক সময় ছাত্ররাজনীতিতে নিজেকে জড়ালাম। জেলা ছাত্রদলের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক থাকাকালে প্রেসরিলিজ নিয়ে স্থানীয় পত্রিকায় যাওয়া আসা ছিল আমার রুটিন বাঁধা কাজ। এই কাজ করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিকের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে। পত্রিকা অফিসগুলোতে গিয়ে দেখতাম সাংবাদিকরা নিউজ লিখছে, ঘটনার খবর পেয়ে দৌড়ে যাচ্ছে সবমিলিয়ে সংবাদচর্চার দৃশ্যপট আমাকে খুবই টানতো। এ পেশায় প্রবেশে ইচ্ছা জাগতো কিন্তু প্রকাশ করার সাহস পেতাম না। একবার সাংবাদিক হওয়ার ইচ্ছে মিটাতে গিয়ে ৩’শ টাকা ঠকেছিও। পত্রিকায় ছোট্র আকারে বিজ্ঞাপন চোখে পড়লো দৈনিক স্বাধীন পত্রিকায় সাংবাদিক নিয়োগ করা হবে। সাংবাদিক শেখার প্রশিক্ষন গাইড বাবদ ৩ শ পত্রিকা অফিসের ঠিকানায় পাঠানোর আহবান। যথারিতি বড় বোনের কাছ থেকে ৩শ টাকা নিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। কিছুদিন পর ডাক পিয়ন হাতে ধরিয়ে দিল লম্বা চওড়া খাকি খাম। খুলে দেখি সাংবাদিকতা শিখুন কিছু মনগড়া সংবাদ লেখার কৌশল, সংবাদ কাঠামো ইত্যাদি ইত্যাদি লেখা ফটোস্ট্যাট কপি ১৫/২০ পিছ কাগজ সাথে আরেকটি আহবান ৩ হাজার টাকা পাঠালে আইডি কার্ড ও ক্যামেরা পাঠানো হবে। এসব দেখে আমার চোখতো চড়ক গাছ। থাক ৩’শতেই ইতি টানলাম।

 

এরপর স্থানীয় পত্রিকার দু একজন সম্পাদকের কাছে ইচ্ছা প্রকাশ করে সাড়া না পাওয়ায় আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে ছাড়েনি। ১৯৯৯ সালের দিকে হঠাৎ আমার বাসার সামনে মিয়াপাড়ার চামড়াগুদাম মোড়ে পল্লীকন্ঠের সম্পাদক নুরুল হক জঙ্গী দাদা হাজির। আমার পুর্ব পরিচিত। আলাপচারিতার এক ফাঁকে তার পত্রিকায় কাজ করার আহবান জানালো। শহরের ফিসারীমোড়ে সাপ্তাহিক পল্লীকন্ঠ অফিসে প্রথমদিন যেতেই জঙ্গী দা বললো, তোমার বাসায় ক্যামেরা আছে, আমি বললাম ইয়াসিকা ক্যামেরা আছে, যাও বটতলা মোড়ে রেল লাইনের পাশে জমি দখলের হিরিক পড়েছে, ছবিসহ নিউজটি করে আনো। বাইসাইকেল চালিয়ে গেলাম ঘটনাস্থলে। গিয়ে দেখি ২৫/৩০টি চালা ঘর তুলছে দখলকারীরা। কেউ চাল লাগাচ্ছে, কেউ বাঁশের বেড়া লাগানোয় মহাব্যস্ত। বাদ যায়নি মসজিদের ইমামও। দখলের চিত্রে হঠাৎ দেখি বটতলা ঈদগাহ মাঠ মসজিদের ইমাম সাহেব কাঁছা মারার মতো পাঞ্জাবী কোমরে বেঁধে টানা দিয়ে দখলকৃত ঘরের চাল বাঁধছে। ক্যামেরার এঙ্গেলে ইমাম সাহেবকে রেখে সারি সারি দখলীয় চালা ঘরের দৃশ্যে ক্লিক। ছবিসহ রেলের জমি দখল শিরোনামে রির্পোট লিখে পত্রিকা অফিসে জমা দিলাম। লেখালেখি ও নিয়মিত পত্রিকা পড়ার অভ্যাস ছিল তাই আমার রির্পোটে কাঁচি চালাতে হয়নি জঙ্গী’দার। প্রথম পাতায় রির্পোটটি প্রকাশিত হলো। প্রথম নিউজেই বাজিমাত। অনেকই বিরোধিতাও করেছে। ধ্যানজ্ঞানে শুরু করলাম সাংবাদিকতা। কখন যে গভীরে চলে গিয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে বিষ বুঝতেই পারিনি। সাংবাদিকতা পরিনত হলো নেশায়। নেশা থেকে পেশা। তাঁরপর সাপ্তাহিক জনক,দৈনিক জনবাংলা হয়ে প্রথম ঢাকার পত্রিকায় কাজ করি সাপ্তাহিক পোস্টকার্ডে। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিল মজিবুর রহমান আর নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন মোতালেব জামালী। তারপর একে একে দৈনিক খবরপত্র,আজকালের খবর,নয়াদিগন্ত,দিগন্ত টেলিভিশন,স্টার মেইল,রাইজিং বিডি বর্তমানে পরিবর্তন ডটকম ও বাংলাদেশের খবর, নিউজ ম্যাগাজিন প্রিয়দেশ এ কাজ করছি। দায়িত্বপালন করছি জনদ্বীপ পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে। যোগদান করবো বাংলাদেশ জার্ণালে। এছাড়াও জামালপুর প্রেসক্লাবে ৩বার যুগ্ন সম্পাদক ও চার বার কার্যনির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হয়ে বর্তমানেও দায়িত্বপালন করছি।

 

পেশাটিকে ভালবেসে পরিশ্রম করেছি দিনে রাতে। নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পিআইবি,গণমাধ্যম ইনিষ্টিটিউট ও ম্যাসলাইন মিডিয়া সেন্টার ( এমএমসি) থেকে স্বল্পকালিন ও দীর্ঘ মেয়াদী রিপোর্টিং এবং ফটোগ্রাোফীর উপর প্রশিক্ষন নিয়েছি। একপর্যায়ে গণমাধ্যম এনজিও এমএমসির জামালপুর জেলা প্রদায়কের দায়িত্ব পালন করি। এখনও সুযোগ পেলেই সাংবাদিকতার প্রশিক্ষনে অংশ নেয়। এ পেশায় শেখার শেষ নেই। দেখতে দেখতে পেশাটিতে ১৯ বছর কাটিয়ে পা রাখলাম ২০ বছরে। এখনো শেখার অনেক রয়েছে বাকি।খবর ফেরি করেই যাচ্ছে সময় কাটছে জীবন। আমি যে এক খবরের ফেরিওয়ালা।

 

লেখক : শওকত জামান, গণমাধ্যম কর্মী।

showkatzaman.jp@gmail.com

error: Content is protected !!