মঙ্গলবার , অক্টোবর ২৩, ২০১৮
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

ভারত-মায়ানমারকে আলাদা করে রেখেছে যে বিদ্রোহ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সম্প্রতি উত্তরপূর্ব ভারতে বেশকিছু মারাত্মক অতর্কিত আক্রমণ সংঘটিত হয়। এ থেকে প্রমাণিত হয় ভারত-মায়ানমার সীমান্তের ওপারে কিছু প্রাচীণ বিদ্রোহী সংগঠন এখনো টিকে আছে এবং তারা তাদের কর্মকাণ্ড ভালোভাবেই চালিয়ে যাচ্ছে।

গত ১৭ জুন ভারতের আধাসামরিক বাহিনী আসাম রাইফেলসের তিনজন সদস্যকে হত্যা করা হয় এবং আরো তিন জন আহত হয়। আসাম ও নাগাল্যান্ডের বিভিন্ন জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠী সরকারি বাহিনীর সাথে এসব সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে।

এমন সময়ে এসব হামলা হলো যখন ক্ষুদ্র নাগা গোষ্ঠীদের সাথে সরকারের একটি শান্তি-চুক্তি বাস্তবায়নের কথা চলছিলো। উলফা (ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অফ আসাম) এর কথা অনেকেই হয়তো জেনে থাকবেন। উত্তরপূর্ব ভারতে তারাই সব থেকে বড় বিদ্রোহী সংগঠন। উলফা নেতারাও সরকারের সাথে এই শান্তি চুক্তির ব্যাপারে বেশ আগ্রহী।

যাইহোক, বিদ্রোহীদের এমন অতর্কিত হামলা হয়তো ভারতের সামরিক ব্যবস্থায় খুব বড় একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি, তবে একটা কথা স্পষ্ট যে এসব বিদ্রোহী সংগঠন এখনো সীমান্তে রক্ত ঝড়ানোর মতো শক্তিশালী অবস্থায় আছে। এবং এ থেকে আরো ধারণা করা যায় , একমাত্র শান্তি চুক্তি করেই হয়তো এসবের একেবারে ইতি টানা সম্ভব নয়।

হামলাগুলো থেকে এও প্রতীয়মান হয়, ভারতের বাইরে গিয়ে মায়ানমারের উত্তরপশ্চিম এলাকায় বিদ্রোহী বাহিনীরা শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসেছে। এর ফলে তারা সহজেই ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর উপর আক্রমণ চালিয়ে আবার সীমান্ত পেরিয়ে নিরাপদ আস্তানায় ফেরত যেতে পারছে।

সত্তরের দশক থেকেই বিদ্রোহীরা মায়ানমারের উত্তরে সাগাইং রাজ্যে নিজেদের ঘাঁটি স্থাপন করে আসছে। কারণ, তখনকার সময়ে ভারতীয় বাহিনী তাদের নাগাল্যান্ড থেকে উৎখাত করতে সমর্থ হয়েছিলো। তাই তারা সীমানা পেরিয়ে মায়ানমারে গিয়ে আশ্রয় নেয়। ভারতীয় বাহিনীর আওতার বাইরে গিয়ে সীমান্তে লুটতরাজ চালাতে থাকে। গত কয়েক দশক ধরে এরা ভারত সরকারের মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারত সরকারের পক্ষ থেকে অনেকবার মায়ানমার সরকারকে আহ্বান জানানো হয়েছে, তারা যেন এসব বিদ্রোহী নাশকতাকারীদের দমনে ভারতীয় বাহিনীকে সাহায্য করে। কিন্তু মায়ানমারের কর্মকর্তারা বরাবরই তাদের সীমানায় ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের ক্যাম্প থাকার কথা অস্বীকার করে আসছে। কিন্তু ভারতের আসামী, নাগা ও মনিপুরী বিদ্রোহী গোষ্ঠীরা বহু বছর ধরে মায়ানমারের শিন্ডিন নদীর তীরে তাগা গ্রামে নিজেদের ক্যাম্প পরিচালনা করে আসছে বলে খবর রয়েছে।

তাগা ক্যাম্পের বর্তমান অবস্থাটি স্পষ্ট নয়, কিছু রিপোর্ট থেকে জানা যায় সেখানে মায়ানমারের সেনাবাহিনী নিজেদের একটি ঘাঁটি বসিয়েছে। কিন্তু তার আশেপাশে বিদ্রোহীদের অবস্থান বেশ স্পষ্ট হওয়ায় সেনাদের বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। এজন্য বিদ্রোহীরা কাছাকাছি ছোট ছোট ক্যাম্প করলেও তাগার সান্নিধ্যেই রয়েছে।

১৭ই জুনের অতর্কিত হামলার প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে দেখা হচ্ছে ন্যাশনাল স্যোশালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ড দলটিকে। তারা এনএসসিএন-কে নামে পরিচিত। শেষের k বর্ণটি যুক্ত করা হয়েছে গত বছর মারা যাওয়া জনপ্রিয় বিদ্রোহী কমান্ডার খাপলাং এর স্মরণে। কিছু কিছু রিপোর্ট বলছে আক্রমণে উলফা জঙ্গিরাও অংশ নিয়েছিলো।

ইউনাইটেড ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট অফ ওয়েস্টার্ন সাউথইস্ট এশিয়া নামের একটি আম্ব্রেলা অরগ্যানাইজেশন উলফা, এনএসসিএন-কে সহ অন্যান্য বিদ্রোহীদের এক ছাতার তোলে নিয়ে আসতে ভূমিকা রাখছে। তাদের ছত্রছায়ায় রয়েছে নাগাল্যান্ড ও মনিপুরের গোষ্ঠীগুলোও। এই প্রদেশগুলোও মায়ানমার সীমান্তে অবস্থিত।

অবস্থা খারাপ হয় যখন ২০১৫ সালে ৪ জুন মণিপুরি বিদ্রোহীরা ১৮ জন ভারতীয় সেনাকে হত্যা করে ও ১৫ জনকে গুরুতর আহত করে। ভারতীয় কমান্ডোরা তখন সীমানা পেরিয়ে মায়ানমারে ঢুকে সেখানকার কিছু বিদ্রোহী ঘাটিতে আক্রমণ চালায়। পরদিন মায়ানমারের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে জানানো হয়, বাইরের কোন বাহিনী মায়ানমারকে ভারতে আক্রমণের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে।

মায়ানমারের দিক দিয়ে দেখলে ব্যাপারটি উভয় সংকটই মনে হয়। সেখানেও কাচিন, পালাউ ও শানের মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। তাই মায়ানমার সরকার নিজেদের দেশের সমস্যা নিয়েই ব্যস্ত। তাছাড়া ভারতীয় বিদ্রোহীরা ভারতে আক্রমণ করেই সেখান থেকে টাকা পয়সা নিয়ে আসছে, সেখান থেকে মায়ানমার সরকারকে ভাগ দিচ্ছে। উপরন্তু তারা মায়ানমারের সেনাবাহিনীর উপরও কোনো আক্রমণ করছে না। তাই মায়ানমার সরকার ব্যপারটিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না।

অপরদিকে যতবারই ভারত এমন অতর্কিত আক্রমণের স্বীকার হয়েছে, সাগাইং রাজ্য থেকে বিদ্রোহী ঘাঁটি সরিয়ে দেয়ার জন্য মায়ানমারের উপর দিল্লীর চাপ ততই বাড়ছে। সীমান্ত অতিক্রম করে আক্রমণের হুমকিও এসেছে।

সম্প্রতি এমন একটা সময়ে এসে হামলার ঘটনা ঘটল যখন ভারত সরকার মায়ানমারের সাথে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

উল্লেখ্য ২০০৫ সালের পর থেকে মায়ানমারের সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের তৎপরতা দুই দেশের সম্পর্ক শীতল করে তুলছে। মায়ানমারের উপর দৃষ্টি রয়েছে চীনেরও। তারা মায়ানমারের অবকাঠামোগত উন্নয়নের পেছনে ইতোমধ্যেই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে।

ধারণা করা হয় উলফা নেতা পরেশ বড়ুয়া চীনের ইউনান প্রদেশে তার কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন। ধারণা করা হয়ে থাকে, তিনিই চীন থেকে অস্ত্রশস্ত্র কিনে তা মায়ানমারে থাকা বিদ্রোহীদের সরবরাহ করছেন। চীনের সিকিউরিটি সার্ভিস এসব দেখেও দেখছে না বলে মনে করা হচ্ছে। ভারত চীনের দীর্ঘদিনের বৈরিতা এক্ষেত্রে ক্রীড়নক হিসেবে কাজ করছে। চীন সরকার চাইছে ভারত তার অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়েই মায়ানমারের সাথে ব্যস্ত থাকুক, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এতে ব্যহত হবে। অন্যদিকে মায়ানমার তার এই দুই প্রতিবেশী পরাশক্তির থেকে চাইছে সর্বাধিক সুবিধা নিতে।

তবে যাই হোক, মায়ানমার এতদিন সময় পেয়ে আসলেও এখন হয়তো সত্যিই তাদের নতুন করে ভাবতে হবে। নতুবা ভারত সীমান্ত অতিক্রম করে তার ক্ষমতা প্রদর্শন করতে বেশি দেরি করবে বলে মনে হয় না!

সূত্রঃ এশিয়া টাইমস