শনিবার , জুলাই ২১, ২০১৮
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ

ধানভানতে শিবের গীত

ফাতিহুল কাদির সম্রাট

বিশ্বকাপের গুষ্ঠি কিলাই। আর কোনো খেলাই দেখুম না। গতকালই কেউ কেউ এমন কথা বলেছেন। আর্জেন্টিনার পরাজয়ে যারা বেশি খুশি সেই হলুদিয়ারা মনের আনন্দকে চাপা দিয়ে গম্ভীর বদনে ক্রেজি আর্জেন্টাইনদের প্রবোধ দিচ্ছেন। নানা সমীকরণ মিলিয়ে দ্বিতীয় পর্বে যাবার আশা দেখাচ্ছেন। আজ শুক্রবার ক্রেজি ভাইয়েরা আখেরাতের কথা ভুলে বেশি দান করবেন, লম্বা মুনাজাত করবেন নিজের দলকে খাদের কিনারা থেকে বাঁচানোর জন্যে। শেষ পর্যন্ত যদি দল না উৎরাতে না পারে তাহলে কেউ টিভি ভাংবেন, ভাই-বন্ধুতে কথা বন্ধ করবেন কেউ, কেউ স্ত্রীর সাথে ভাগ করা শয্যাকে আলাদা করবেন, কেউ বিশ্বকাপের গুষ্ঠি মারবেন এবং খেলা আর দেখবেন না।

এটা মুদ্রার এপিঠ। মুদ্রার ওপিঠে আছে যে হলুদিয়া ভাইবেরাদর ক্রেজিপনায় আরও এককাঠি সরেস। আজ যদি তাদের দল খোদা না করুন হোঁচট খায়, তারাও একই আচরণ শুরু করবেন। আজকের জুমাবারে মসজিদে গিযে তারা সর্বান্তকরণে প্রার্থনা করবেন, দান খয়রাত করবেন সাম্বানৃত্য যাতে বন্ধ না হয়, সেজন্যে।

আমরা যারা লেখালেখি করি তাদের বড়ই সাবধানে কথা বলতে হয়। সবাই ধর্মীয় স্কেল দিয়ে লেখার বিচার করে। ফ্রেন্ড লিস্টে অন্য ধর্মের মানুষ আছে দেখে একজন আমাকে বলে বসলেন, হাদিস অনুযায়ী আমার হাশর-নাশর হবে সেই কাফেরদের সাথে।আমার ফ্রেন্ডলিস্টে কে পুরা নাস্তিক আর কে আধা নাস্তিক সেটার খবরও রাখেন কেউ কেউ। আমি বলি, ভাই আমার লিস্টে তাবলিগি এবং সালাহ উদ্দিন আইয়ুবির শিষ্যও তো আছে। তাদের সাথে হাশর নাশর হবে না কেনো? একথার উত্তর পাই না।

বিশ্বকাপে আমাদের এই ধর্মীয় জজবা আর থাকে না। বিশ্বকাপে ইহুদি-নাসারার দলই প্রায় সব। আর্জেন্টিনা খেলোয়াড়দের সবাই নাসারা।তারা এক খাচ্চর জাতি। তাদের অনেকের পিতৃপরিচয়ই নেই। ম্যারাডোনা তিন সন্তান জন্ম দেওয়ার পর বিয়ে করেন। তার নিজের বাবা কে তা তিনি জানেন না। এই সংস্কৃতি যদি ঈমান আমলের সাথে সাংঘর্ষিক না হয় তাহলে আমার কিছুই বলার নেই। আর্জেন্টিনা ব্রাজিল প্রতিবেশী। আর্থ-সামাজিক চরিত্রও এক। তবে ঈমানে আমলে ব্রাজিল আরেকটু খাঁটি বটে! তাদের উদ্বাহু সাম্বানৃত্য ও বীচ ভলিবলকে ইসলামি তাহজিব-তমুদ্দুনের অংশ ভাবতে পারলে খারাপ হয় না। ব্রাজিলের সুন্দরী রমণীরা বিনোদনশিল্পের প্রাণ।জাতীয় আয়ে তাদের নৈশশ্রমের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। মাশা আল্লাহ, আমরা ঈমানী জোশ থেকে তবু ব্রাজিল ব্রাজিল করে গলা ফাটাচ্ছি।

বিশ্বকাপে কয়েকটি দেশ আছে যারা আমাদের অকুন্ঠ সমর্থন পেতে পারে, তাদের প্রথমে জাপান। এশিয়ার দেশ বলে কেবল নয়, জাপান আমাদের নিঃস্বার্থ বন্ধু। বাংলাদেশকে জাপান কী পরিমাণ অর্থ সাহায্য দিয়েছে তা হিসেব করলে মাথা ঘুরে যাবে। অথচ কোনো স্বার্থ তাদের নেই। যমুনা সেতু বানিয়ে দিয়েছে কিন্তু ছোটোখাটো কোনো কন্ট্রাক্ট পর্যন্ত চায়নি। সুইডেন, ডেনমার্ক ও পর্তুগালও নিঃস্বার্থ দাতাবন্ধু। ডানিডার পানির ট্যাংক পৌরসভাগুলোতে দৃশ্যমান। স্কানিয়া বাস কিন্তু সুইডেনের। বিশ্বকাপে এই দেশগুলো আমাদের সমর্থন পায় না। আমরা অকৃতজ্ঞ। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক রাশিয়াকে সমর্থন করা অনেকে কম্যুনিস্টভূমি হিসেবে নাজায়েজ মনে করেন।

ইরানীদের সমর্থন না করতে অনকে অনুরোধ করেছেন কারণ তারা শিয়া মুসলিম। পশ্চিমা বিশ্বের সাথে ইরান ফাইট দিচ্ছে, ইসরাইলকে তটস্থ রাখছে, তাতে কাজ হচ্ছে না। কারণ তারা বিশুদ্ধ মুসলমান নয়। নবী (স)-র জন্মস্থান কেবলাভূমি সুন্নি সৌদিদের হালেও কিন্তু পানি পায়নি। সেনেগাল ৯৪ ভাগ মুসলমানের দেশ। হজরত বেলাল (রা)-র বর্ণগোত্রীয় গরিব সেনেগালের জন্যে দাঁড়ানোর পক্ষে ঈমান সায় দেয় না। সমর্থন পায় না আধা মুসলিম আধা খ্রিস্টান নাইজেরিয়াও। ইবনে বতুতার দেশ মরক্কোর নামটা কারো মুখে শুনলাম না। ক্রুসেডজয়ী সালাহউদ্দিন আইয়ুবির মিসরও থেকে গেল মনোযোগের বাইরে।

আমাদের সমর্থন প্রধানত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা এবং তারপর ক্ষীণভাবে জার্মানি, ফ্রান্স ও স্পেনে সীমাবদ্ধ। ব্রাজিল আর্জেন্টিনার গুণগান আগেই গেয়েছি। জার্মানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল কুশীলব, খ্রিস্টানদের দেশ। ফ্রান্স বোরকা নিষিদ্ধ করেছে, তাদের প্রধান নেশা অনৈসলামিক কাজ ছবি আঁকা, ভাস্কর্য বানানো, অর্কেস্ট্রায় সুর তোলা। আর স্পেন তো কর্ডোভাকেন্দ্রিক মুসলিম সাম্রাজ্য ও সভ্যতার হন্তারক। কর্ডোভার গ্রান্ড মসজিদকে তারা বানিয়েছে গির্জা। সেখানে সম্রাট ফার্ডিনান্ডের শবাধারের পা কোরানের দিক করে রাখা হয়েছে।

আমার এসব কথা শুনে বলবেন, ধান ভানতে শিবের গীত রাখুন। খেলা, খেলাই। এখানে ধর্ম কেনো, রাজনীতি কেনো? আমি বলি, এ কথা বলাও আরেক খেলা, আরেক রাজনীতি। সবকিছুতে ধর্ম টেনে আনতে মরিয়া, আর খেলার বেলাতেই এক্কেবারে উদার, দিলদরিয়া, এটাতো হয় না। আসলে আমরা শক্তির পূজারী। বড়ো দল যাদের জয়ী হবার সম্ভাবনা থাকে তাদের পুচ্ছ ধরে নাচতে আমরা ভালোবাসি। এটা পুচ্চগ্রাহী ও নত মানসিকতার প্রমাণ।

মানলাম, খেলা খেলাই। তাহলে খেলাকে খেলা হিসেবেই মেনে নিন। এত ক্রেজিপনার দরকার কী? মজা নিতে খেলা দেখুন। হারজিতকে খেলার অংশ হিসেবে মেনে নিন। আকাশি-হলুদে ভ্রাতৃঘাতী কলহ বন্ধ করুন। সবাই মিলে খেলা দেখি স্পোর্টসম্যানশিপ মন নিয়ে। যারা ভালো খেলবে, পরিচ্ছন্ন খেলবে, তাদের উদ্বাহু বাহবা দেবো। কে হারল কে জিতল তাতে আমাদের কী? কেউ তো আমাদের বাপ-দাদা নয়!